রমা একাদশী ব্রত মাহাত্ম্য || Rama Ekadashi Vrata Mahatmya ||

কার্ত্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশী তিথিতে পালিত হয় রমা একাদশী। অন্যান্য একাদশীর মত রমা একাদশী পালন করলেও বিপুল পরিমান পাপ বিনাশ হয় এবং মহাপূণ্যলাভ হয়ে থাকে। রমা একাদশীর ব্রত মাহাত্ম্য পাঠ বা শ্রবণ করলেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অসীম কৃপা ও পারলৌকিক ফল পাওয়া যায়।

রমা একাদশী ব্রত মাহাত্ম্য
রমা একাদশী ব্রত মাহাত্ম্য

রমা একাদশী ব্রত মাহাত্ম্য

একসময় যুধিষ্ঠির মহারাজ শ্রীকৃষ্ণকে বললেন, “হে জনার্দন। কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশীর নাম ও মাহাত্ম্য কৃপা করে আমায় বলুন।”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন “হে রাজন, আপনি যে একাদশীর ব্রত মাহাত্ম্য জানতে চেয়েছেন তা মহাপাপ দূরকারী, মহা ফলদায়িনী এবং রমা একাদশী নামে ত্রিভূবনে বিখ্যাত। আপনার জ্ঞানতৃষ্ণা নিবারণ করার জন্য আমি এখন মহাপূণ্যদায়িনী রমা একাদশী ব্রত মাহাত্ম্য বর্ণনা করছি, আপনি অনুগ্রহপূর্বক তা মনোযোগ সহকারে শবণ করুন।”

একটু থেমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলা শুরু করলেন, “পুরাকালে মুচুকুন্দ নামে একজন সুপ্রসিদ্ধ রাজা ছিলেন। স্বর্গাধিপতি দেবরাজ ইন্দ্র, মৃত্যুদেবতা যম, জলাধিপতি বরুণ ও ধনপতি কুবেরের সাথে তার মিত্রতা ও সখ্যতা ছিল। এছাড়াও ভক্তশ্রেষ্ঠ বিভীষণের সাথেও তার অত্যন্ত সদ্ভাব ছিল। পক্ষান্তরে, তিনি ছিলেন পরম বিষ্ণুভক্ত, ন্যায়বান ও সত্যপ্রতিজ্ঞ। আর এসকল গুণাবলির সমন্বয়ে এবং ধর্ম, নীতি ও প্রজ্ঞার অনুসারে রাজ্যশাসন করতেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ  একাদশী কী? কিভাবে একাদশী আবির্ভাব হলো, একাদশী পালনের নিয়মাবলী, একাদশী মাহাত্ম্য

মহারাজ মুচুকুন্দের চন্দ্রভাগা নামক একটি অত্যন্ত সুলক্ষণা কন্যা ছিল। পরিণত বয়সে চন্দ্রসেনের পুত্র শোভনের সাথে বিবাহ হয়েছিল চন্দ্রভাগার। একদা চন্দ্রভাগা পিত্রালয়ে অবস্থান করার সময় তার পতি শোভন শ্বশুরালয়ে বেড়াতে এসেছিলেন কিছু দিনের জন্য। দৈবক্রমে, শোভন যেদিন মহারাজ মুচুকুন্দের বাড়িতে এসেছিলেন, সেদিন ছিল রমা একাদশী তিথি। পতিপরায়ণা চন্দ্রভাগা নিজ স্বামীকে আসতে দেখে প্রথমে আপ্লুত হলেও ক্ষণিকের মধ্যে দুশ্চিন্তার বলিরেখা দেখা দিল তার মুখমণ্ডলে।  তিনি মনে মনে চিন্তা করতে লাগলেন,- হে ভগবান! আমার পতি শারিরীকভাবে অত্যন্ত দুর্বল, তিনি ক্ষুধা সহ্য করতে পারেন না। অন্যদিকে, আমার পিতার শাসন খুবই কঠোর। গতকাল দশমীর দিন তিনি নাগরা বাজিয়ে ঘোষণা করে দিয়েছেন যে, একাদশীর দিনে আহার নিষিদ্ধ। আমি এখন কি করি!

চন্দ্রভাগার মনের এই দোটানা বুঝতে পারলেন স্বামী শোভন। তিনি একান্তে চন্দভাগাকে ডেকে বললেন, “প্রিয়তমা, আমি খেয়াল করেছি, আমাকে দেখামাত্র তুমি আপ্লুত হলেও পরক্ষণেই তোমার কপালে চিন্তার ভাজ ভেসে উঠেছে। কি এমন দোলাচলে সংশয়াপন্ন তুমি, আমাকে বিস্তারিত বলো।”

চন্দ্রভাগা কিছুটা ইতস্তত হয়ে সেদিনকার একাদশী তিথি ও তার পিতার কঠোরতার কথা বিস্তারিতভাবে খুলে বললেন স্বামী শোভনকে।  তার মুখে রাজার মুচুকুন্দের নিষেধাজ্ঞা শুনে শোভন তার প্রিয়তমা পত্নীকে বলল- “হে প্রিয়ে, এখন আমার কি কর্তব্য, তা আমাকে বলো।”

উত্তরে রাজকন্যা চন্দ্রভাগা বললেন, “হে স্বামী, আজ এই গৃহে এমনকি রাজ্যমধ্যে কোন ব্যক্তিই আহার গ্রহণ করবে না। তাছাড়া মানুষের কথা তো দূরে থাকুক এরাজ্যে পশুরা পর্যন্ত একাদশী তিথিতে অন্নজল গ্রহণ করে না। তাই হে নাথ, যদি তুমি এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ চাও তবে তুমি তোমার নিজগৃহে প্রত্যাবর্তন কর। তুমি যদি একাদশী চলাকালীন এখানে আহার গ্রহণ করো তাহলে তুমি সকলের নিন্দাভাজন হবে এবং সেইসাথে আমার পিতাও ক্রুদ্ধ হবেন। এখন বিশেষভাবে বিচার করে যা ভাল হয়, তুমি তাই কর।”

সাধ্বী স্ত্রীর কথা শুনে শোভন বললেন, “হে প্রিয়ে! তুমি ঠিকই বলেছ, একাদশীতে অন্নগ্রহণ করা মহাপাপ। এমনকি তোমার পিতার এই কঠোরতা নিরর্থক নয়। আমি শারিরীক দূর্বলতার কারনে ক্ষুধা সহ্য করতে পারিনা সেকথা ভেবে তুমি হয়ত দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়েছ। কিন্তু তা সত্তেও আমি ঠিক করেছি কিন্তু আমি গৃহেও যাব না এবং অন্নগ্রহণও করবো না । আমি এখানে থেকেই নিষ্ঠার সাথে একাদশী ব্রত পালন করব। তারপর শ্রীহরি আমার ভাগ্যে যা নির্দ্ধারণ করবেন আমি তাই মেনে নেব।”

শোভন ব্রত পালনে বদ্ধপরিকর হলে একই সাথে আনন্দ ও শঙ্কা ভর করল রাজকন্যা চন্দ্রভাগার মনে। তবে পতিব্রতা হওয়ার কারনে তিনি শোভনের এই সিদ্ধান্তে দ্বিমত করলেন না। এভাবে সেদিনকার একাদশী তিথির সমস্ত দিন অতিক্রান্ত হয়ে রাত্রি শুরু হল। বৈষ্ণবদের কাছে সেই রাত্রি সত্যিই আনন্দকর। কিন্তু শোভনের পক্ষে তা ছিল বড়ই দুঃখদায়ক। কেননা ক্ষুধা-তৃষ্ণায় তিনি ক্রমে ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়লেন। এবং এভাবে রাত্রি অতিবাহিত হলে সূর্যোদয়কালে তার মৃত্যু হল।

একাদশী ব্রতের মত মহান ব্রত পালন করতে গিয়ে নিজের জামাতা পরলোকগতি লাভ করেছেন জেনে রাজা মুচুকুন্দ সাড়ম্বরে তার শবদাহকার্য সুসম্পন্ন করলেন। আর অকাল বিধবা চন্দ্রভাগা স্বামীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমাপ্ত করে পিতার আদেশে পিতৃগৃহেই বাস করতে লাগলেন।

কালক্রমে রমা একাদশী ব্রত প্রভাবে শোভন মন্দরাচল শিখরে অনুপম সৌন্দর্যবিশিষ্ট এক রমণীয় দেবপুরী প্রাপ্ত হলেন। এবং সেখানেই বসবাস করতে শুরু করলেন। এরপর কেটে গেল কিছুকাল।

আরও পড়ুনঃ  একাদশীর উপবাস-দিন নির্ণয়-বিভ্রান্তি ও সমাধান

একদা মুচুকুন্দপুরের নিবাসী সোমশর্ম্মা নামক এক সৎ ব্রাহ্মণ তীর্থভ্রমণ করতে করতে উপস্থিত হলেন শোভনের সেই দেবপুরীতে। সেখানে রত্নমণ্ডিত বিচিত্র স্ফটিকখচিত সিংহাসনে রত্নালঙ্কারে ভূষিত রাজা শোভনকে তিনি দেখতে পেলেন। গন্ধর্ব ও অস্পরাগণ দ্বারা নানা উপচারে সেখানে তিনি পূজিত হচ্ছিলেন। সোমশর্ম্মা চিনতে পারলেন, এই ব্যক্তি রাজা মুচুকুন্দের জামাতা শোভন। তিনি সাগ্রহে সিংহাসনে উপবিষ্ট শোভনের কাছে গেলেন এবং নিজের পরিচয় দিলেন। নিজ শ্বশুরালয়ের আত্মীয়ের পরিচয় পেয়ে শোভনও সেই ব্রাহ্মণকে দেখে আসন থেকে উঠে এসে তাঁর চরণ বন্দনা করলেন।

তিনি শ্বশুর মুচুকুন্দ ও স্ত্রী চন্দ্রভাগা সহ নগরবাসী সকলের কুশলবার্তা জিজ্ঞাসা করলেন ব্রাহ্মণের কাছে। ব্রাহ্মণ সোমশর্ম্মাও  সকলের কুশল সংবাদ জানালেন। তিনি শোভনকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এমন বিচিত্র মনোরম স্থান কেউ কখনও দেখেনি। আপনি কিভাবে এই স্থান প্রাপ্ত হলেন, তা সবিস্তারে আমার কাছে বর্ণনা করুন।” শোভন বললেন, “হে ব্রাহ্মণদেবতা, কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষীয়া রমা একাদশী সর্বব্রতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। আমি শ্বশুরালয়ে অবস্থানকালীন সময়ে শ্রদ্ধার সাথে সেই ব্রত পালন করেছিলাম। এবং সেই অলৌকিক ব্রত পালনের ফল হিসেবে আমি এই রমণীয় দেবপুরী প্রাপ্ত হয়েছি। আপনি কৃপা করে আমার প্রিয়তমা পত্নী চন্দ্রভাগাকে সমস্ত ঘটনা জানাবেন।”

শোভনের মুখে রমা একাদশী ব্রত পালনের ফলের কথা শুনে অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের নয়ন। তিনি শোভনকে প্রাণভরে আশির্বাদ করে বিদায় নিলেন সেই রমণীয় দেবপুরী থেকে।

সোমশর্ম্মা মুচুকুন্দপুরে ফিরে এসে সর্বপ্রথমে গেলেন রাজকন্যা চন্দ্রাভাগার কাছে। তিনি তার কাছে শোভনের সাথে তার দেখা হওয়ার সমস্ত ঘটনার কথা জানালেন। ব্রাহ্মণের কথা শুনে অত্যন্ত আনন্দিত ও আপ্লুত হলেন চন্দ্রভাগা। তিনি ব্রাহ্মণকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “হে ব্রাহ্মণ দেবতা! আপনার কথা আমার কাছে স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে।”  তখন সোমশর্ম্মা বললেন, “হে পুত্রী, সেখানে তোমার স্বামীকে আমি স্বয়ং সচক্ষে দেখেছি। অগ্নিদেবের মতো দীপ্তিমান তার নগরও দর্শন করেছি। কিন্তু তার নগর স্থির নয়, তা যাতে স্থির হয় সেই মতো কোন উপায় কর।” এসব কথা শুনে চন্দ্রভাগা বললেন, “তাকে দেখতে আমার একান্ত ইচ্ছা হচ্ছে। হে ব্রাহ্মণদেবতা, যদি সম্ভব হয় তাহলে আমাকে এখনই তার কাছে নিয়ে চলুন। আমি আমার ব্রত পালনের পুণ্যপ্রভাবে এই নগরকে স্থির করে দেব।”

চন্দ্রভাগার মুখ থেকে একথা শোনার পর ব্রাহ্মণ সোমশর্ম্মা চন্দ্রভাগাকে নিয়ে মন্দার পর্বতে বামদেবের আশ্রমে উপনীত হলেন। সেখানে ঋষির কৃপায় ও হরিবাসর ব্রত পালনের ফলে চন্দ্রভাগা দিব্য শরীর ধারণ করলেন। এরপর দিব্য গতি লাভ করে নিজ স্বামীর নিকট উপস্থিত হলেন তিনি। দীর্ঘকাল পরে মিলন ঘটল শোভন ও চন্দ্রভাগার। প্রিয় পত্নী চন্দ্রভাগাকে স্বচক্ষে দেখতে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হলেন শোভন। চন্দ্রভাগাও স্বামীর মুখদর্শনে অনাবিল আনন্দ লাভ করলেন।

বহুদিন পর স্বামীর সঙ্গ লাভ করে চন্দ্রভাগা অকপটে নিজের পুণ্যকথা জানালেন। “হে প্রিয়, আজ থেকে আট বছর আগে আমি যখন পিতৃগৃহে ছিলাম তখন থেকেই এই রমা একাদশীর ব্রত নিষ্ঠাসহকারে পালন করতাম। ঐ পুণ্য প্রভাবে এই নগর স্থির হবে এবং মহাপ্রলয় পর্যন্ত থাকবে।”

এবার আরও একটু বিরতি নিয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন, “হে মহারাজ যুধথিষ্ঠির! এরপর মন্দারাচল পর্বতের শিখরে শোভন তার স্ত্রী চন্দ্রভাগা সহ দিব্যসুখ ভোগ করতে লাগলেন। আর আমি পাপনাশিনী ও ভুক্তি-মুক্তি প্রদায়িনী রমা একাদশীর ব্রত মাহাত্মা আপনার কাছে বর্ণনা করলাম। যিনি এই একাদশী ব্রত শ্রবণ করবেন, তিনি সর্বপাপ মুক্ত হয়ে বিষ্ণুলোকে পূজিত হবেন।”

রমা একাদশী ব্রত পালনের নিয়ম

অন্যান্য একাদশী ব্রতের মত রমা একাদশীর মূল নিয়ম হচ্ছে পঞ্চরবিশস্য বর্জন করে নিরন্তর শ্রীভগবানের চিন্তন-গুণগান করা। তাই একাদশী ব্রত পালনের জন্য আপনি যে মতেরই অনুসরন করুন না কেন, সর্বদান শ্রীভগবানের প্রতি সমর্পণ ও ভক্তি প্রদর্শনই হচ্ছে একাদশীতে আপনার মূল কর্ম। আসুন  জেনে নেওয়া যাক সাত্ত্বিকভাবে কিভাবে রমা একাদশী পালন করতে হয়।

রমা একাদশীর মূল নিয়ম (সাধ্য অনুযায়ী)

সমর্থ হলেঃ

  • দশমী দিনে একাহার, একাদশী দিনে নিরাহার, ও দ্বাদশীর দিনে আবারও একাহার করুন।
  • সম্ভব হলে একাদশীর রাতে জাগরণ ও শ্রীভগবানের পূজা করুন।

আংশিক অসমর্থ হলেঃ

  • শুধুমাত্র একাদশীর দিন অনাহার করুন।

অতি অসমর্থ হলেঃ

  • একাদশীর দিনে পঞ্চ রবিশস্য পরিত্যাগ করে ফলমূল এবং হালকা খাবার গ্রহণ করার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ ধান্যজাতীয় শস্য বর্জন করে সহজপাচ্য ফল, শাক বা নিরামিষ পদ গ্রহণ করা যেতে পারে।

রমা একাদশীর অন্যান্য নিয়ম

  • সামর্থ্যপক্ষে রাত্রি জাগরণ করুন, এতে শ্রীভগবান আপনার প্রতি বিশেষভাবে প্রীত হন।
  • গোড়ীয় ধারার আচার্যবৃন্দ অথবা অন্যান্য আচার্য্যবৃন্দ যেভাবে একাদশী পালনের অনুমোদন দিয়েছেন সেগুলো পালন করুন।
  • সম্পূর্ণভাবে নিরাহার থাকতে অপারগ হলে রমা একাদশীতে স্বল্পমাত্রায় সবজি বা ফলমূলাদি গ্রহণ করতে পারেন।
  • রমা একাদশীতে অনুমোদিত খাদ্যতালিকায় রয়েছে গোল আলু , মিষ্টি আলু , চাল কুমড়ো , পেঁপে , টমেটো, ফুলকপি ইত্যাদি। এসকল সবজি ঘি অথবা বাদাম তৈল দিয়ে রন্ধন করে প্রথমে শ্রীভগবানকে উৎসর্গ করুন। অতপরঃ তা স্বল্পমাত্রায় করে আহার করতে পারেন । (রান্নায় হলুদ, মরিচ, ও লবণ ব্যবহার করতে পারেন) ।
  • অন্যান্য অনুমোদিত আহারঃ দুধ ,কলা , আপেল , আঙ্গুর, আনারস, আখঁ, আমড়া শস্য, তরমুজ, বেল, নারিকেল, মিষ্টি আলু , বাদাম ও লেবুর শরবত ইত্যাদি ফলমূলাদি গ্রহণ করতে পারেন।

উল্লেখ্য, যারা সাত্ত্বিক আহারী নন এবং বিভিন্ন প্রকার নেশা জাতীয় গ্রহণ করেন, তারা এগুলো একাদশী তিথিতে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করুন। কারন একাদশী ব্রত পালন করলে যে কেবলমাত্র নিজের জীবনের সদ্ গতি হবে তা কিন্তু নয় । একাদশী পালনকারী ব্যক্তির প্রয়াত পিতা  বা মাতা যদি নিজ কর্ম দোষে নরকবাসীও হন , তবুও পুত্র যদি নিষ্ঠার সাথে একাদশী ব্রত পালন করেন তাহলে তিনি তার পিতা-মাতাকে নরক থেকে উদ্ধার করতে পারেন । মনে রাখবেন, একাদশীতে অন্ন ভোজন করলেও নরকবাস হয় আবার অন্যকে অন্ন ভোজন করালেও নরকবাস হয়। কাজেই একাদশী পালন করা আমাদের সকলেরই কর্তব্য।

রমা একাদশীতে নিষিদ্ধ খাদ্য (পঞ্চ রবিশস্য)

  • ধান জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন – চাউল,মুড়ি, চিড়া, সুজি, পায়েশ, খিচুড়ি, চাউলের পিঠা, খৈ ইত্যাদি।
  • গম জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন – আটা,ময়দা, সুজি , বেকারীর রূটি , বা সকল প্রকার বিস্কুট ,হরলিকস্ জাতীয় ইত্যাদি ।
  • যব বা ভূট্টা জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন — ছাতু , খই , রূটি ইত্যাদি ।
  • ডাল জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন — মুগ মাসকলাই , খেসারী , মসুরী, ছোলা অড়হড় , ফেলন, মটরশুটি, বরবটি ও সিম ইত্যাদি ।
  • সরিষার তৈল , সয়াবিন তৈল, তিল তৈল ইত্যাদি ।

উপরোক্ত পঞ্চ রবিশস্য যেকোন একটি একাদশীতে গ্রহণ করলে ব্রত নষ্ট হয় ।

রমা একাদশীতে নিষিদ্ধ কর্ম

  • একাদশী ব্রতের আগের দিন মধ্যরাতের (রাত ১২ টার আগেই) অন্ন ভোজন সম্পন্ন করে নিলে সর্বোত্তম।
  • ঘুমানোর আগে দাঁত ভালোভাবে ব্রাঁশ করে দাঁত ও মুখ গহব্বরে লেগে থাকা সব অন্ন পরিষ্কার করে নিতে হবে। সকালে উঠে শুধু মুখ কুলি ও স্নান করার অনুমতি রয়েছে।
  • একাদশীতে সবজি কাটার সময় সতর্ক থাকতে হবে যেন কোথাও কেটে না যায় । কারন একাদশীতে রক্তক্ষরণ বর্জনীয় । দাঁত ব্রাশঁ করার সময় অনেকের রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে । তাই একাদশীর আগের দিন রাতেই দাঁত ভালো ভাবে ব্রাশঁ করে নেওয়াই সর্বোত্তম।
  • রমা একাদশীর মাহাত্ন্য ভগবদ্ভক্তের শ্রীমুখ হতে শ্রবণ অথবা সম্ভব না হলে নিজেই ভক্তি সহকারে পাঠ করতে হয় । ব্রত মাহাত্ম্য পঠন বা শ্রবণ না করলে একাদশী ব্রতের ফল সংকুচিত হয়।
  • যারা একাদশীর প্রসাদ রান্না করেন ,তারা পাঁচ ফোড়ঁন ব্যবহারে সতর্ক থাকুন। কারণ পাঁচ ফোড়ঁনে সরিষার তৈল ও তিল থাকতে পারে যা সকল একাদশীতে বর্জনীয় ।
  • রমা একাদশীতে অন্যান্য একাদশীর মত শরীরে প্রসাধনী ব্যবহার নিষিদ্ধ । তৈল ( শরীরে ও মাথায় ) সুগন্ধি সাবান শ্যাম্পু ইত্যাদি বর্জন করুন।
  • অন্যান্য একাদশীর মত রমা একাদশীতে সকল প্রকার ক্ষৌরকর্ম যেমনঃ শেভ করা এবং চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকুন ।

রমা একাদশীর পারণ

পঞ্জিকাতে একাদশী পারণের ( উপবাসের পরদিন সকালে ) যে নির্দিষ্ট সময় দেওয়া থাকে , সেই সময়ের মধ্যে পঞ্চ রবিশস্য ভগবানকে নিবেদন করে, প্রসাদ গ্রহণ করে পারণ করা একান্ত দরকার । নতুবা একাদশীর কোন ফল লাভ হবে না । একাদশী ব্রত পালনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল উপবাস করা নয় , নিরন্তর শ্রীভগবানের নাম স্মরণ , মনন , ও শ্রবণ কীর্তনের মাধ্যমে একাদশীর দিন অতিবাহিত করতে হয় । এদিন যতটুকু সম্ভব উচিত । একাদশী পালনের পরনিন্দা, পরিচর্চা, মিথ্যা ভাষণ, ক্রোধ দুরাচারী, স্ত্রী সহবাস সম্পূর্ণ রূপে নিষিদ্ধ ।

রমা একাদশীর পারণ মন্ত্র

একাদশ্যাং নিরাহারো ব্রতেনানেন কেশব।
প্রসীদ সুমুখ নাথ জ্ঞানদৃষ্টিপ্রদো ভব।।
অর্থাৎ, হে কেশব (ভগবান বিষ্ণু), আমি এই ব্রতের মাধ্যমে একাদশীতে নিরাহার থেকেছি। হে সুমুখ (সুন্দর মুখমণ্ডলযুক্ত) নাথ, আমার প্রতি প্রসন্ন হোন এবং আমাকে জ্ঞানদৃষ্টি প্রদান করুন। 
* সনাতন ধর্মের বিভিন্ন তথ্য জানতে ইউটিউব বা ফেসবুকে আমাদেরকে সাবস্ক্রাইব / ফলো করতে ভুলবেন না।
5/5 - (1 vote)

Leave a Comment

error: Content is protected !!