You are currently viewing পুরীর জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা কি? ||  Snana Yatra of Jagannath Dev || 2022

পুরীর জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা কি? || Snana Yatra of Jagannath Dev || 2022

রথযাত্রা ও স্নানযাত্রা শব্দ দুটির সরাসরি সাথে জড়িয়ে আছেন শ্রীক্ষেত্র পুরীধামের শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেব। জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি যাওয়া এবং আসাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয় রথযাত্রা। এই রথযাত্রার উৎপত্তি, ইতিহাস ও বিস্তারিত কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে আমাদের পূর্ববর্তী একটি ভিডিওতে। আপনারা চাইলে উপরের আই বাটনে ক্লিক করে ভিডিওটি দেখে নিতে পারেন। তবে আজ আমাদের আলোচনার বিষয় রথযাত্রা নয়। আজ আমরা জানব, স্নানযাত্রা সম্পর্কে। স্নানযাত্রা আসলে কি?, এই দিনে কি ঘটে থাকে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে, কবে, কখন, কোথায় ও কিভাবে শুরু হয়েছিল এই স্নানযাত্রা, কি ফল লাভের উদ্দেশ্যে লক্ষ লক্ষ ভক্তগন পুরীধামে সমবেত হন স্নানযাত্রা দর্শন করার জন্য, কেন স্নানযাত্রার পরের ১৫ দিন জগন্নাথ দেবের দর্শন পাওয়া যায় না? প্রথম কমেন্টে রইল এ বছরের স্নানযাত্রার দিন ও তারিখ। আশা করি এই মহাপুণ্যদায়ক স্নানযাত্রার মাহাত্ম্য সকলেই মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করবেন এবং কমেন্ট বক্সে অবশ্যই জয় জগন্নাথ লিখে কমেন্ট করবেন।

জৈষ্ঠ্য মাসের প্রখর খরতাপে পৃথিবীতে যখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, তখন দেবতারও বুঝি ইচ্ছে হয় স্নানটা সেরে নেওয়ার জন্য। আর জগন্নাথ দেবের সেই স্নানযাত্রার তিথিটিই হচ্ছে জৈষ্ঠ্য পূর্ণিমা বা দেবস্নানা পূর্ণিমা। জগতের প্রতিপালকের এই স্নানযাত্রাকে কেন্দ্র করে ঝলমলে সজ্জায় সেজে ওঠে সমগ্র পুরীধাম। নানা রকমের বর্ণিল আয়োজন আর রীতি রেওয়াজের মধ্য দিয়ে পালিত হয় স্নানযাত্রা। তবে স্নানযাত্রার আয়োজন ও ইতিহাসকে জানার আগে চলুন জেনে নেওয়া যাক স্নানযাত্রাকে নিয়ে কি বলছে পুরাণ।

স্কন্দ পুরাণে পুরুষোত্তম ক্ষেত্র মাহাত্ম্য বর্ণনায় বলা হয়েছে, “জ্যৈষ্ঠী পূর্ণিমায় শ্রী হরির স্নানযাত্রা দর্শনের মাধ্যমে অনায়াসেই জীব মুক্তি লাভ করতে পারে। এমন কি কেউ যদি ভক্তি সহকারে একবারও স্নান যাত্রা মহোৎসব দর্শন করেন, তাঁর সংসার বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ সুনিশ্চিত হয়ে যায়। তাকে আর শোক করতে হয় না। জৈমিনি ঋষি স্নান যাত্রার মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ভগবান পুরুষোত্তমের স্নানযাত্রা দর্শন করলে সমস্ত তীর্থ সমূহে স্নান করার থেকেও শতগুণ অধিক ফল প্রাপ্ত হওয়া যায় এবং এতে কোনো সংশয় নেই।”

আরও পড়ুনঃ  আপনার রাশি অনুযায়ী আপনার কোন দেবতার উপাসনা করা উচিত?

স্কন্দপুরাণে জৈমিনি ঋষি আরোও বলেছেন, “যদি কেউ আন্তরিকতার সাথে স্নান কালে ভগবানকে নিরীক্ষণ করে, তাদেরকে আর মাতৃগর্ভে বাস করতে হয় না। উৎসুকতাপূর্ণ হৃদয়ে স্নানযাত্রা দর্শন করলে জীবগণ ভবসাগর থেকে উদ্ধার লাভ করতে পারে। পরম আনন্দ সহকারে স্নানযাত্রা দর্শন করলে মানুষ আজন্ম যা পাপ করেছে তা বিনষ্ট হয়ে যায়।”

এবার আসুন জেনে নেওয়া যাক, স্নানযাত্রা কি?

জৈষ্ঠ্য পূর্ণিমার মহেন্দ্রক্ষনে জগন্নাথকে স্নান করানোর যে আয়োজন সেটিই হচ্ছে স্নানযাত্রা। স্কন্ধ পুরাণ অনুসারে রাজা ইন্দ্রদুম্ন যখন জগন্নাথদেবের কাঠের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন তখন থেকেই শুরু হয় এই স্নান যাত্রা উৎসব। অর্থাৎ এই দিনটিকে জগন্নাথ দেবের আবির্ভাব তিথি বা জন্মদিন হিসেবে পালন করা হয় সমগ্র পুরীধামে। এই কারনে দেবস্নানা পূর্ণিমার পূণয় তিথি এবং স্নানযাত্রা উৎসব প্রভু জগন্নাথের সকল ভক্ত তথা বৈষ্ণবদের জন্য একটি অত্যন্ত শুভ দিন। জনশ্রুতি রয়েছে, এদিন জগন্নাথ দেবের দর্শন করলে গত জন্ম ও এই জন্মের সব পাপ বিনাশ করেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। উল্লেখ্য স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণই পুরীতে জগন্নাথ বা দারুব্রহ্ম রূপে অবস্থান করেন।

 

যাইহোক, এবার জানব স্নানযাত্রার সেই বিশেষ রীতি রেওয়াজের কথা যা দেখতে দেশ বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নামে পুরীধামে।

স্নানযাত্রার ঠিক আগের দিন পুরীর মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রার বিগ্রহ তুলে নিয়ে আসা হয় বিশেষভাবে তৈরি করা স্নান বেদীতে। পুরীর মন্দিরপ্রাঙ্গনে বিশেষ ভাবে তৈরি করা এই মণ্ডপকে বলা হয় স্নান মণ্ডপ। এটা এত উঁচু যে মন্দির প্রাঙ্গনের বাইরে থেকেও বেদিতে উপবিষ্ট বিগ্রহ সমূহ স্পষ্টভাবে অবলোকন করা যায়। শুধু তাই নয়, নানা রকমের ঐতিহ্যবাহী ফুল, বাগান ও গাছের চিত্রকল্প দ্বারা সজ্জিত করা হয় এই স্নান মন্ডপটিকে।

এরপর আসে স্নানযাত্রার দিন। এদিন মন্দিরের দেবতা বিগ্রহদের স্নানের জন্য জল সংগ্রহ করেন পুরোহিতগণ। আপনারা জেনে অবাক হবেন, শুধুমাত্র জগন্নাথ দেবেকে স্নান করানোর জন্য পুরীতে রয়েছে সোনাকুয়া নামের এক বিশেষ ধরনের কুয়া। শোনা যায় এই কুয়াতে নাকি কখনো সুর্যের আলো পড়েনি। যাইহোক, এই কুয়া থেকে স্নানযাত্রার জল আনেন পুরোহিত এবং সেবকগণ। জল আনার সময় পুরোহিত ও সেবগণ তাদের মুখ কাপড় দিয়ে এমনভাবে ঢেকে রাখেন, যাতে তাদের মুখনিঃসৃত কোন কিছু দ্বারা এমনকি তাদের নিঃশ্বাস দ্বারাও যেন জগন্নাথের পবিত্র স্নানের জল দূষিত না হয়। এই জল একে একে এনে রাখা হয় ১০৮টি সোনার ঘড়ায়। জনশ্রুতি রয়েছে এই জলে মিশ্রিত হয় নানা রকমের সুগন্ধি ও বিভিন্ন ভেষজ ঔষধি উপাদান। তাছাড়া মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমেও শুদ্ধিকরণ করা হয় দেবের স্নানের এই জল। অন্যদিকে স্নানযাত্রাকে কেন্দ্রকে সমানতালে এগিয়ে চলে বিগ্রহের সাজসজ্জা। জগন্নাথ,বলরাম এবং সুভদ্রা দেবীকে আবৃত করা হয় নরম সিল্কের কাপড় দ্বারা এবং লাল এক ধরনের পাউডার দিয়ে অতি যত্নে দেওয়া হয় প্রলেপ। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে বিগ্রহের চারপাশ। আর থাকে সুগন্ধি ধূপ ও ধুনো। এরপর শুরু হয় মূল স্নানপর্ব।

আরও পড়ুনঃ  রহস্যময় ও অলৌকিক আদিনাথ মন্দিরের ইতিহাস

বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ, কীর্তন এবং শঙ্খনাদে আধাত্ম্যিক এক পরিবেশের সূচনা হয় পুরীর মন্দির প্রাঙ্গণে। আর সেই স্বর্গীয় পরিবেশে তালে তালে চলে জগন্নাথের জলাভিষেক। ক্রমে ক্রমে ১০৮ ঘড়া জলে স্নানকার্য সম্পন্ন হয় জগন্নাথদেবের।

 

জগন্নাথদেবের গজবেশ

স্নানযাত্রার দিন সন্ধ্যাবেলা স্নানপর্বের সমাপ্তির পর জগন্নাথ ও বলভদ্রকে গণেশের রূপে সাজানোর জন্য হস্তীমুখ-বিশিষ্ট মস্তকাবরণী পরানো হয়। জগন্নাথের এই রূপটিকে বলা হয় ‘গজবেশ’। পাশাপাশি সুভদ্রাদেবী ধারন করেন পদ্মবেশ।

কিন্তু জানেন কি কেন প্রভু জগন্নাথ এই গজবেশ ধারন করেন?

জনশ্রুতি বলছে একবার কর্ণাট দেশের কানিয়ারি গ্রামের গণপতি ভট্ট নামক একজন ব্রাক্ষ্মণ নীলাচলে স্নান যাত্রায় উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি গানপত্য বা গনেশের উপাসক ছিলেন বিধায় শ্রীজগন্নাথের মন্দির পরিদর্শনে আগ্রহী ছিলেন না। রাজা তাঁকে বোঝালেন, “শ্রীজগন্নাথ সকল দেবদেবীর স্বরূপে বিরাজিত, গণেশ তারই এক রূপভেদ মাত্র।” রাজার নানা যুক্তিতে অবশেষে সেই ব্রাক্ষ্মণ মন্দির পরিদর্শনে গেলেন। দিনটি ছিল স্নান যাত্রার দিন। ব্রাক্ষ্মণ গণপতি ভট্ট বিগ্রহ গনের সামনে দাড়িয়ে বললেন , “ হে দারুব্রহ্ম, আপনি যদি সকল দেবদেবীর স্বরূপে বিরাজিত হন , তাহলে অনুগ্রহ করে আমাকে আমার আরাধ্যদেব শ্রীগনেশের রূপ প্রদর্শন করান।”

এর পরেই ঘটে গেল এক অলৌকিক ঘটনা। শ্রীজগন্নাথ সেই ব্রাহ্মণের প্রতি অহৈতুকী কৃপা প্রদর্শনের সংকল্প করে নিজেকে গনেশ রুপে পরিবর্তীত করেন। শুঁড় যুক্ত সহাস্য বদন জগন্নাথকে দর্শন করে সেই ভক্ত মহাবিস্ময় ও মহা আনন্দে অভিভুত হয়ে গেলেন। সেই থেকে স্নাযাত্রার পর নিয়মিতরুপে শ্রীজগন্নাথ ও বলরামের স্নান বেদিতে গণেশ বেশ এবং সুভদ্রা দেবীর ‘পদ্মবেশ’ হয়ে থাকে।

তাই বলা হয় জগন্নাথ মহাপ্রভু পঞ্চদেবতার স্বরূপেই প্রকাশিত হন। শয়নে তিনি শ্রী নারায়ণ, গমনে তিনি শ্রী সূর্য্য, ভোজনে তিনি রুদ্র, স্নানে তিনি শ্রী গনেশ, এবং রত্নবেদীতে তিনি আদ্যা মহাবিদ্যা শ্রীদক্ষিণকালিকা।

 

যাইহোক, স্নানযাত্রার শেষে প্রথাগত বিশ্বাস অনুসারে, জগন্নাথ প্রতীকী অসুস্থ হয়ে পড়েন। অর্থাৎ, ১০৮ ঘড়া জলে স্নান করে জ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। তাই এই সময় তাকে রাখা হয় রাজবৈদ্যের চিকিৎসাধীনে এবং গোপন একটি সংরক্ষিত কক্ষে। জগন্নাথের এই অসুস্থতার পর্যায়টি ‘অনাসর’ নামে পরিচিত ভক্তদের কাছে। এই সময় ভক্তেরা দেবতা জগন্নাথের দর্শন পান না। তাদের দর্শনের জন্য বিগ্রহের পরিবর্তে মূল মন্দিরে রাখা হয় তিনটি পটচিত্র। কথিত আছে, রাজবৈদ্যের আয়ুর্বৈদিক ‘পাঁচন’ খেয়ে এক পক্ষকাল তথা ১৫ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন জগন্নাথদেব। তারপর ১৬তম দিনে দাদা বলরাম ও বোন সুভদ্রাকে নিয়ে রথে চেপে চলে যান মাসির বাড়ি তথা গুন্ডিচার মন্দিরে। আর এই মাসির বাড়ি যাওাকেই বলা হয় রথযাত্রা।

আরও পড়ুনঃ  হিন্দু নারীদের মাসিক ধর্ম পালনের সময় ধর্ম-কর্ম, আচার-ব্রত, পূজা-পার্বণ, ধর্মীয় স্থানে প্রবেশ বিধি

 

জেনে রাখা ভালো, ১০৮ ঘড়া জলে স্নান করার ফলে জগন্নাথ বিগ্রহ বিবর্ণ হয়ে পড়ে। তাই এই ১৫ দিনে জগন্নাথদেবকে আগের নব সাজে ফিরিয়ে আনা হয়। এবং ১৬ তমদিনে জগন্নাথ দেবকে আবার সবার দর্শনের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে দেবতা কিভাবে জ্বরে আক্রান্ত হতে পারেন? আসলে শ্রীজগন্নাথের অনাসর সময়টি মূলত তার একটি লীলা।  বলা হয়, এই সময় তিনি সবার অগোচরে থেকে প্রত্যেকের হৃদয়ে ভগবানের প্রতি প্রেমকে তিনি আরো সমৃদ্ধ করেন বিরহের দ্বারা। এবং ভক্ত এবং ভগবানের বিরহ পরবর্তী মিলনের জন্য নব শৃঙ্গারে সুসজ্জিত হন জগন্নাথদেব।

5/5 - (1 vote)

Leave a Reply