You are currently viewing ভগবান শিবের ১৯ জন অবতারের পরিচয় || 19 Avatars (incarnations) of Shiva ||

ভগবান শিবের ১৯ জন অবতারের পরিচয় || 19 Avatars (incarnations) of Shiva ||

ভগবান বিষ্ণুর দশাবতার সম্পর্কে আপনারা সকলেই অবগত। এমনকি কলিযুগের অন্তিমে ভগবান বিষ্ণুর কল্কি অবতারের বিষয়টিও একটি বহূল চর্চিত বিষয়? কিন্তু দেবাদিদেব মহাদেবের অবতার নিয়ে তেমন কোন আলোচনা দেখা যায় না কেন? আসলে শৈব ধর্মে শিবের অবতারত্ব তেমন গুরুত্ত্ব পায় না এবং সার্বজনীনভাবে স্বীকৃতও হয় না। তবে আপনারা হয়ত অনেকেই জেনে থাকবেন, কূর্ম পুরাণ ও লিঙ্গপুরাণে শিবের ২৮টি করে অবতারের উল্লেখ রয়েছে। আবার শিবপুরাণ অনুসারে জানা যায় শিবের অবতারের সংখ্যা ১৯টি। তবে এখানে জেনে রাখা ভালো, শ্রীবিষ্ণুর অবতার ও শিবের অবতারগণের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান। অবতার ধারনের সময় শ্রীবিষ্ণু তাঁর সমস্ত ঐশ্বরিক ও শুভ শক্তি নিয়ে পৃথিবীতে পাপীদের বিনাশ করার জন্য অবতার রূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু শিবের অবতারগনের মধ্যে অনেকেই রুদ্রাংশ বা শিবাংশ তথা শিবের অংশ বা রুদ্রের অংশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। যে কারণে শিবাংশ বা শিবের অবতারদের মধ্যে কেউ কেউ বিপথে গমন করেছিলেন, কাম ক্রোধ, লোভ থেকে নিজেকে সংযত করতে পারেননি এবং কেউ কেউ বেছে নিয়েছিলেন পাপের পথ। তাই শ্রীবিষ্ণুর অবতারগণকে স্বয়ং শ্রীবিষ্ণু হিসেবে মান্যতা প্রদান করা হলেও, শিবের অবতার বা শিবাংশ মানেই কিন্তু শিব নন। আবার কোন কোন মতে ভগবান শিব তাঁর বেশ কিছু অবতারে ক্রোধ, মোহ, পাপ প্রভৃতির পরিণতি কি হতে পারে তা মানুষকে দেখানোর জন্যই বিপথে গমন করেছিলেন। যাইহোক, শিবপুরাণে বর্ণিত ভগবান শিবের এই ১৯টি অবতারের সাথে আপনাদের পরিচিত করানোর জন্যই আমাদের আজকের আয়োজন। আশা করি ভিডিওটির শেষ পর্যন্ত আমাদের সাথেই থাকবেন এবং ভিডিওটি থেকে নতুন কিছু জানতে পারলে কমেন্টে একবার হর হর মহাদেব লিখে যাবেন।

১. পিপ্পলাদ অবতার

আপনারা নিশ্চই মহামুনি দধিচীর নাম শুনে থাকবেন। এই দধিচী মুনি ও স্বর্চার ঘর আলো করে জন্ম নিয়েছিলেন ভগবান শিবের অবতার পিপ্পলাদ। একদা এই পরিবারের উপরে গ্রহরাজ শনিদেবের বক্রদৃষ্টি পতিত হয়েছিল। এরই মধ্যে স্বর্গভূমিতে উত্থান ঘটল বিত্রাসুর নামের এক ভয়ংকর অসুরের। তাঁর তাণ্ডবে স্বর্গহারা হয়ে দেবতারা এলেন মুনিবর দধিচীর কাছে। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল মুনির অস্থি দিয়ে বজ্র নির্মাণ করে সেই অস্ত্রে বৃত্রাসুরের প্রাণ নাশ করা। দেবতাদের কাছ থেকে এই আর্জি শোনার পর হাসিমুখে নিজের দেহত্যাগ করেছিলেন মহামুনি দধিচী। আর মুনিপত্নী স্বর্চাও শিশুপুত্র পিপ্পলাদকে অরণ্যের মধ্যে রেখে স্বামীর সাথে সহমরণে গিয়েছিলেন। বড় হয়ে পিপ্পলাদ যখন জানতে পারেন শনিদেবের কুদৃষ্টিতেই তাঁর পরিবারের এই করুণ পরিস্থিতি ঘটেছিল, তখন তিনি শনিদেবকে নক্ষত্রপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাওয়ার অভিশাপ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে দেবতাদের অনুরোধে পিপ্পলাদ শনিদেবকে  এই শর্তে ক্ষমা করেন দেন যে, ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত শনিদেব কাউকে ক্ষতি করতে পারবেন না। সেকারনে দেবাদিদেব মহাদেবের পিপ্পলাদ অবতারের ধ্যান করলে শনিদেবের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

২. নন্দী অবতার

কৈলাসের দ্বারপাল বা শিবের বাহন হিসেবে যে বৃষরূপী নন্দীকে আমরা দেখে থাকি তিনিও দেবাদিদেব মহাদেবের একটি অবতার। একদা মহর্ষি শিলাদ নামের এক শিবভক্ত ঋষি ছিলেন। তিনি ছিলেন শাস্ত্রজ্ঞানী ও শাস্ত্র নির্দেশিত পথেই জীবন ধারণ করতেন তিনি। একদা তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের আদেশে সন্তান উতপাদনে ব্রতী হন। এসময় তিনি তাঁর আরধ্য শিবের কাছে একটি মৃত্যুহীন পুত্র হিসেবে স্বয়ং শিবকেই নিজের পুত্র হিসবে দাবী করেছিলেন। দেবাদিদেব মহাদেবও শিলাদের এই মনবাঞ্ছা পূর্ণ হওয়ার আশির্বাদ দেন। এর কিছুকাল পরে জমিতে লাঙল দেওয়ার সময় তিনি ষাড়ের মুখমণ্ডল বিশিষ্ট ও চতুর্ভূজ একটি পুত্র প্রাপ্ত হন। এই পুত্রই হচ্ছে নন্দী মহারাজ। পরবর্তীতে নন্দীদেবও দেবাদিদেব মহাদেবের তপস্যায় ব্রতী হন এবং শিবের কাছে তাঁর বাহনের স্থান পাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। দেবাদিদেব নন্দীদেবের এই কঠোর তপস্যায় প্রসন্ন হয়ে নন্দীকে নিজের বাহন হিসেবে ও কৈলাসের দ্বারপাল হিসেবে নিযুক্ত করেন। বলা হয় যে মনুষ্য নন্দীদেবের বিগ্রহের কানে স্বীয় মনস্কামনা জানাবেন, সেই কামনা তিনি পূর্ণ করবেন।

৩. বীরভদ্র অবতার

ভগবান শিবের উগ্র রূপগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে বীরভদ্র। আপনারা সকলেই দক্ষযজ্ঞের ঘটনা সম্পর্কে কমবেশী জেনে থাকবেন। দক্ষযজ্ঞে বিনা নিমন্ত্রনে এবং শিবকে ছাড়াই হাজির হয়েছিলেন দেবী সতী। কিন্তু সেখানে পিতা দক্ষ কর্তৃক নিজ স্বামী ভোলানাথ শিবের নিন্দা ও অপমান সহ্য করতে পারেননি তিনি। তাই সেই যজ্ঞের আগুনেই আত্মহূতি দিয়েছিলেন ভগবতী সতী। এসংবাদ দেবাদেদেব মহাদেবের কাছে পৌছানোমাত্রই তীব্র ক্রোধে জ্বলে ওঠেন তিনি। এরপর তাঁর মাথার জট উৎপাটন করে তিনি সৃষ্টি করলেন বীরভদ্র নামের এক উগ্র অবতারকে। এই বীরভদ্র ও তাঁর শক্তি ভদ্রকালী তাঁদের বহু সহচর ও সহচরী শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে দক্ষযজ্ঞে হানা দিয়ে অকল্পনীয় রকমের ধ্বংসযজ্ঞ সাধন করেন এবং প্রজাপতি দক্ষের শিরোচ্ছেদ করে দেন। সেদিন বীরভদ্রের প্রকোপ থেকে বাঁচতে পারেননি যজ্ঞে উপস্থিত মুনি ঋষি ও দেবতাগণও। পরবর্তীতে দেবাদিদেব মহাদেব তাঁকে ক্ষমা করেন ও তাঁর ছিন্ন মাথার স্থলে তিনি একটি ছাগমুণ্ড স্থাপন করে দেন।

৪. কালভৈরব অবতার

ভৈরব বা কালভৈরব রূপটি ভোলানাথ শিবের আরও একটি উগ্র ও বিনাশী রূপ। কালভৈরবের উৎপত্তি সম্পর্কে যে কাহিনীটী জানা যায় তা হলঃ সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার আদিতে পাঁচটি মস্তক বা মাথা ছিল। অন্যদিকে শিবও পঞ্চানন তথা ৫টি মস্তকের অধিকারী।কিন্তু ব্রহ্মা যখন  শিবের থেকে অধিক গুরুত্ব দাবি করেন এবং অসম্ভব অহঙ্কার প্রকাশ করতে থাকেন তখন ভগবান শিব ব্রহ্মার পঞ্চম মস্তকটি কর্তন করেন। ব্রহ্মার চার মাথা চারটি বেদের জ্ঞান সম্পন্ন। কিন্তু এই পঞ্চম মস্তক ছিলো কামাবৃত্ত । সেই কারনে ব্রহ্মার পঞ্চম মস্তক তথা কামাবৃত মস্তকটি ছিন্ন হওয়া মাত্রই ব্রহ্মা নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমাপ্রার্থী হন। কিন্তু ব্রহ্মার মস্তক কর্তনের ফলে ব্রহ্মহত্যার পাপ অর্পিত হয় স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেবের উপর।এর ফলে ব্রহ্মা-কপাল হাতে নিয়ে শিবকে এক দীর্ঘ সময় ভ্রাম্যমান অবস্থায় কাটাতে হয়। এই ভ্রাম্যমান শিবরূপই হচ্ছেন ‘ভৈরব’। তাছাড়া মহাজগতের বিশেষ স্থানগুলি রক্ষা করার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে ভৈরবের উপর। ভৈরবের মোট সংখ্যা ৬৪ এবং এই ৬৪জন ভৈরব আবার ৮টি শ্রেণিতে বিভক্ত। এই ৮ টি শ্রেণির প্রধান ৮ জন ভৈরবকে বলা হয় অষ্টাঙ্গ ভৈরব। ভৈরবগণ মূলত শিবমন্দিরের রক্ষাকর্তা হিসেবে বিবেচিত হন। তবে এর পাশাপাশি দেবী সতীর শক্তিপীঠগুলোর রক্ষক হিসেবেও নিযুক্ত রয়েছেন এক একজন ভৈরব। তাই শক্তিপীঠ মন্দিরের আশেপাশেই দেখতে পাওয়া যায় ভৈরব মন্দির।

৫. শরভ অবতার

ভগবান শিবের এই অভূতপূর্ব অবতারের নাম শরভেশ্বর, শরভেশ্বরমূর্তি বা শরভাবতার। লিঙ্গপুরাণে বর্ণিত দেবাদিদেব মহাদেবের এই অবতার সম্পর্কে জানা যায়, মনুষ্য, সিংহ এবং খেচর বা পাখীর সংমিশ্রণে আবির্ভূত হয়েছিলেন মহাদেবের শরভাবতার । ভগবান শরভ ছিলেন অষ্টপদ বিশিষ্ট, কৃষ্ণবর্ণ, উচ্চ নাসিকা সম্পন্ন, উচ্চ নখ বিশিষ্ট ও একটি দীর্ঘ পুচ্ছধারী অবতার।  লিঙ্গপুরাণ মতে, অত্যাচারী রাজা হিরন্যকশিপুকে সংহারের পরেও ভগবান বিষ্ণুর অবতার শ্রীনৃসিংহ দেবের ক্রোধ প্রশমিত হচ্ছিল না। তাঁর তীব্র ক্রোধে ত্রিলোকে প্রলয় নেমে আসার সম্ভাবনা দেখা দিলে ভগবান শিব শরভ অবতার ধারণ করেছিলেন। শরভাবতার শ্রী নৃসিংহদেবের ক্রোধকে শান্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং আসন্ন প্রলয় থেকে ত্রিলোককে রক্ষা করেছিলেন।

আরও পড়ুনঃ  সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী ৯ জন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী || 9 Hindu Nobel Prize Winners ||

৬. গৃহপতি অবতার

ভক্তের আকুল আবেদনে তাঁদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করার জন্য দেবাদিদেব মহাদেব আবির্ভূত হয়েছিলে গৃহপতি অবতারে। পুরাকালে নর্মদা নদীর তীরবর্তী স্থানে বিশ্বনার ও শুচীস্মতি নামের এক পরম শিবভক্ত দম্পত্তি বাস করতেন। কিন্তু পরম ধার্মিক এই দম্পতি ছিলেন নিঃসন্তান। অনেক তপস্যায়ও কোন সন্তান লাভ না করতে পেরে বিশ্বানর সস্ত্রীক হাজির হলেন বারাণসীতে। সেখানে বিশ্বেশ্বর শিবলিঙ্গের সামনে বসে কঠোর তপস্যায় রত হলেন তাঁরা। কিছুকাল পরে তাঁরা শিবলিঙ্গের উপরে এক জ্যোতির্ময় শিশুমূর্তি দেখতে পেলেন। বিশ্বানর বুঝলেন ভগবান শিব তাঁদের আহবানে সাড়া দিয়েছেন। তিনি ভোলানাথের শিশুমূর্তি দেখে অভিভূত হয়ে হয়ে ভগবান শিবকেই নিজের পুত্র হিসেবে চাইলেন। আর ভগবানও ভক্তের ভক্তির বাঁধনে বাধিত হয়ে বিশ্বানরকে সেই বর প্রদান করে  গৃহে ফেরত পাঠানলেন।

কিছুকাল পরে এই দম্পতির জীবন ধন্য করে জন্ম নিলেন গৃহপতি। কিন্তু তাঁকে দেখতে এসে নারদ মুনি জানালেন এই বালক গ্রহদোষের কারনে স্বল্প আয়ু সম্পন্ন এবং অগ্নিজনিত দূর্ঘটনার কারনে ১২ বছর বয়সে এর মৃত্যু হবে। গৃহপতিকে পেয়ে বিশ্বানর ও শুচীস্মতি দম্পত্তি তাঁদের জীবনে যে পুষ্পিত কানন সজ্জিত করেছিলেন নারদের কথায় তা যেন মুহূর্তের মধ্যেই কালবৈশাখী ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। তখন গৃহপতি বলেন, হে পিতৃদেব, মাতৃদেব, আপনারা মহাদেবের তপস্যা করে আমাকে লাভ করেছেন। তিনি সকল দূর্ভাগ্যকে খণ্ডন করতে পারেন। তাই আমিও সেই আদিদেবকে তপস্যায় সন্তুষ্ট করে আপনাদের দুঃখ দূর করব। এরপর বালক গৃহপতি ঘর ছেড়ে গঙ্গাতীরে মাটি দিয়ে শিবলিঙ্গ নির্মাণ করে শুরু করলেন শ্রী সংকরের তপস্যা। এবং মহাদেবের কৃপালাভ করে নিজের গ্রহদোষ ও পিতা মাতার দুর্ভাগ্য দূর করেছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর নির্মিত গঙ্গাতীরের সেই শিবলিঙ্গের নামকরণ করা হয় অগ্নিশ্বর শিবলিঙ্গ।

৭. দুর্বাসা অবতার

দেবতা থেকে সাধারন মানুষ যার অভিশাপের ভয়ে থর থর করে কাঁপতেন তিনি হচ্ছেন ঋষি দূর্বাসা। তিনি অভিশাপ দিয়ে দেবতাদেরকে শ্রীহীন করেছিলেন,  অপ্সরা পুঞ্জস্থলাকে পরজন্মে বানরী হওয়ার অভিশাপ দিয়েছিলেন এবং তাঁর গর্ভে শ্রীহনুমানের জন্ম হওয়ার আশির্বাদ দিয়েছিলেন, তাছাড়া রাজা দুস্মন্ত এই মুনির শাপেই শকুন্তলাকে বিস্মৃত হয়েছিলেন। তিনি এতটাই ক্রোধী ছিলেন যে তাঁর অভিশাপ থেকে তাঁর স্ত্রীও রেহাই পাননি। এমনকি একবার নিজের ইষ্টদেব মহাদেবকেই অভিশাপ দিয়ে বসেছিলেন ঋষি দুর্বাসা।

যদিও ক্ষেত্রবিশেষ মঙ্গলময় বর বা আশির্বাদও প্রদান করেছিলেন দুর্বাসা, তবে তাঁর ভয়ংকর অভিশাপগুলোর জন্যই আজও তাঁকে স্মরণ করা হয়। তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর কারনে মারাত্মক সব অভিশাপ দেওয়া এই ঋষির জন্ম হয়েছিল ঋষি অত্রির পত্নী অনুসূয়ার গর্ভে। দুর্বাসা শব্দের অর্থ যার সাথে বাস করা যায় না। কিন্তু কেন বাস করা যায় না, সেটা আর নতুন করে খুলে বলার দরকার পড়ে না। ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ মতে, একবার ব্রহ্মা এবং শিবের মধ্যে প্রচন্ড মনোমালিন্য হয়। এই সংঘাতের ফলে শিব এতটাই ক্রোধান্বিত হয়ে ওঠেন যে, দেবতারা পর্যন্ত তাঁর ভয়ে পালাতে আরম্ভ করেন। এই সংবাদে দেবাদিদেব মহাদেবের পত্নী দেবী পার্বতী অত্যন্ত ক্ষুণ্ণ হন। এবং তিনি মহাদেবের সাথে বাস করতে অক্ষমতা প্রকাশ করেন। তাই নিজের ক্রোধাগ্নির ফলে সৃষ্টি হওয়া অনর্থের কথা চিন্তা করে মহাদেব তা বর্জন করতে সম্মত হন। এরপর ঋষি অত্রির পত্নী অনুসূয়ার গর্ভে তিনি তার সেই প্রবল ক্রোধাগ্নি স্থাপন করেন। মহাদেবের এই ক্রোধাগ্নির থেকে জন্ম হয় ঋষি দুর্বাসার। যেহেতু মহাদেবের ক্রোধের ফলে তাঁর জন্ম হয়েছিল, সেজন্য ঋষি দুর্বাসা সামান্য কথাতে ক্ষুণ্ণ হয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠতেন। এবং এই একই কারনে দুর্বাসাকে শিবের অবতার, শিবাংশ বা রুদ্রাংশ নামেও ডাকা হয়। তবে ভগবান বিষ্ণুর ভক্ত অম্বরীষের প্রতি এই ক্রোধ প্রদর্শন করতে গিয়ে দারুনভাবে  হেনস্থা হয়েছিলেন দুর্বাসা। এই অবতারে ভগবান শিব মানুষকে দেখিয়েছিলেন ক্রোধের পরিণাম কি মারাত্মক হতে পারে।

৮. অশ্বত্থামা অবতার

মহাভারতের অশ্বত্থামা চরিত্রটির সাথে আপনারা সকলেই পরিচিত। ঋষি ভদ্বাজের পুত্র দ্রোণাচার্য ও কৃপীর পুত্র হিসেবে জন্মেছিলেন মহাভারতের এই মহাপরাক্রমশা্লী বীর। জন্মের সময় অশ্বের মত শব্দ করে ক্রন্দন করেছিলেন বলেই তাঁর নাম হয়েছিল অশ্বত্থামা। তিনি জন্মগতভাবে তাঁর মাথায় এক মহামূল্যবান মণি লাভ করেছিলেন যার প্রভাবে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তি ও যন্ত্রনাকে তিনি জয় করতে পারতেন। তবে অস্ত্রবিদ্যায় মহাবীর হিসেবে পরিগণিত হলেও ব্যাক্তি হিসেবে অশ্বত্থামা ছিলেন প্রচণ্ড পাপিষ্ঠ, নীতি-নৈতিকতা ও বিবেক বর্জিত এবং পাষণ্ড এক নরাধম। নীতি বিসর্জন দিয়ে দুর্যোধনের পক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া, রাতের আধারে ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র দ্রৌপদীর পুত্রদের, শিখণ্ডীকে এবং ধৃষ্টদ্যুম্নসহ অসংখ্য পাণ্ডব বীরদের হত্যা করা, উত্তরার গর্ভস্থ পরীক্ষিতকে হত্যা করার জন্য ব্রহ্মাস্ত্র আহবান করা প্রভৃতি ঘৃণ্য কর্মের জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মাথার মণি কেড়ে নিয়ে অমরত্বের অভিশাপ দিয়েছিলেন।

কিন্তু যদি বলি এই দুষ্টমতি অশ্বত্থামা ছিলেন রুদ্রের অবতার, তাহলে অবাক হবেন নিশ্চই? আজ্ঞে হ্যাঁ দ্রোণের তপ্যার প্রভাবে রুদ্রাংশ হিসেবে জন্ম হয়েছিল অশ্বত্থমার। এখন স্বভাবিকভাবে মনে প্রশ্ন জাগে মহাদেব কেন তাঁর এই অবতারে পাপের পঙ্কিল পথ বেছে নিয়েছিলেন? শাস্ত্রজ্ঞদের মতে মহাদেব তাঁর এই অবতারে মানুষকে দেখাতে চেয়েছিলেন হিংসা, পাপ, লোভ ও কুসঙ্গের প্রভাবে মানুষের কি মারাত্মক রকমের পরণতি হতে পারে। আর সেই পরিণতি ভোগ করতেই আজও তাঁর শরীর মনে তীব্র যন্ত্রনা নিয়ে অমরত্বের অভিশাপ বহন করে চলেছেন অশ্বত্থামা।

৯. ঋষভ অবতার

লিঙ্গপুরাণ থেকে জানা যায়, দেবাসুরের সংগ্রাম একদা পরিণতি পেয়েছিল সমুদ্র মন্থনে। এই ঘটনায় দেবতা ও অসুরগণ মিলে সমুদ্র মন্থনে প্রচেষ্ট হন। তো সমুদ্র মন্থন থেকে অমৃত কলসের পাশাপাশি আর বহু রকমের স্বর্গীয় সত্ত্বা ও রত্ন উত্থিত হয়েছিল। ভাগবত পুরাণ, বিষ্ণুপুরাণসহ বহু পৌরাণিক গ্রন্থ থেকে জানা যায় সমুদ্র মন্থন থেকে দেবী শ্রীলক্ষ্মীর সাথে সাথে বেশ কিছু সুন্দরী কন্যার আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু শ্রীবিষ্ণু দেবী শ্রীলক্ষ্মীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার পর সেই কন্যাগন ঈর্শান্বিত হয়ে পড়েন। তখন তাঁরা শ্রীবিষ্ণুকে পতিরূপে প্রাপ্ত করার জন্য ও বিষ্ণুর অংশে পুত্র সন্তান প্রাপ্ত করার জন্য ঘোর তপস্যায় ব্রতী হন। অগত্যা শ্রীবিষ্ণু তাঁদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন এবং তাঁদের প্রত্যেককে সন্তান দান করেন। কিন্তু বিষ্ণুর সেই সন্তানগনের কারনে সৃষ্টির বিনাশ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে ব্রহ্মার অনুরোধে ভগবান শিব একটি ষাঁড়ের রূপ ধারণ করে শ্রীবিষ্ণুর সেই সন্তানদের বধ করেন। ভগবান শিবের ষাড়রূপী অবতারের নাম ছিল রিষভ অবতার। তবে ভাগবত পুরাণ অনুসারে রিষভ অবতারকে শ্রীবিষ্ণুর ২৪টি অবতারের অন্যতম বলে বর্ণনা করা হয়েছে। 

১০. যতিনাথ অবতার

পুরাকালে অম্বুদাচল নামক পাহাড়ের পাদদেশ সংলগ্ন জঙ্গলে আহুক এবং আহুকা নামক এক শিবভক্ত  ভীল দম্পতি বাস করতেন। এই দম্পত্তি ছিলেন অতিশয় দরিদ্র। তবে তাঁরা ছিলেন খুবই অতিথিপরায়ণ। জঙ্গলে বসবাসকারী মুনিঋষিদের সেবাযত্ন করা এবং জঙ্গলে পথ ভুলে যাওয়া মানুষদেরকে পরম যত্নে আশ্রয় দিয়ে তাদের সেবাযত্ন করতেন তাঁরা। একদিন রাত্রিকালে যতীনাথ নামের এক ব্রাহ্মন এসে হাজির হলেন তাঁদের কুটিরে। ভীল দম্পতি সহাস্যবদনে সেই ব্রাহ্মণকে আশ্রয় দিয়ে সাধ্যমত তাঁকে আপ্যায়ন করেন। এরপর ব্রাহ্মণ ঘুমিয়ে পড়লে আহুকা তাঁর পদসেবা করতে লাগলেন এবং আহুক কুটিরের বাইরে পাহারা দিতে লাগলেন। কিন্তু কিছুক্ষন পর এক ক্ষুধার্ত সিংহ এসে আহুককে ভক্ষন করল। অতিথির পদসেবা করতে করতে আহুকা সবকিছু দেখেও স্বামীকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেলেন না পাছে অতিথির ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে। অতিথি যে স্বয়ং নারায়ণ। তাই সারা রাত স্বামীর মৃত্যুশোক বুকে চেপে অতিথির পদসেবা করলেন আহুকা।

আরও পড়ুনঃ  গঙ্গা কে? তিনি কিভাবে পৃথীবীতে এলেন? গঙ্গাস্নান করলেই কি পাপ দূর হয়?

সকালে ঘুম থেকে উঠে সেই অতিথি ধারণ করলেন স্বয়ং মহাদেবের রূপ। তিনি এই দম্পত্তিকে আশির্বাদ করলেন পরজন্মে আহুক জন্ম নেবেন নিষাধরাজ বীরসেনের পুত্র নল হিসেবে এবং আহুকা জন্ম নেবেন  বিদর্ভরাজ ভীমের কন্যা দময়ন্তী হিসেবে। এবং নল ও দময়ন্তীর মিলনের জন্য স্বয়ং মহাদেব স্বর্ণহংসের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন। ভগবান শিবের এই যতীনাথ অবতার আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছিলেন যে নিঃস্বার্থ অতিথিসেবা ঈশ্বর সেবারই সমতুল্য এবং এই মহান কর্মের জন্য স্বয়ং ভগবানের পক্ক থেকে পুরষ্কারের ব্যাবস্থা রয়েছে। 

১১. হনুমান অবতার

আপনারা অনেকেই জেনে থাকবেন রুদ্রের ১১তম অবতার ছিলেন শ্রী হনুমান। পবনদেবের আশির্বাদে মাতা অঞ্জনী আর পিতা কেশরীর ঔরসে জন্ম হয়েছিলেন শ্রীহনুমানের। হনুমানের মাতা অঞ্জনী দেবী পূর্বজন্মে পুঞ্জস্থলা নামক এক স্বর্গের অপ্সরা ছিলেন। এবং দুর্বাসা মুনির অভিশাপে ভূলোকে বানরী রূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ভগবান শিবের বাহন নন্দিদেব রাবণকে অভিশাপ দিয়েছিলেন নর এবং বানর রাবণের ধ্বংসের কারন হবে। তাই হনুমানরূপে ভগবান শিব পশুকুলে আবির্ভূত হন রাবণের বিনাশ করার জন্য। হনুমানজীর বীরবিক্রমের কথা রামায়ণে বর্ণিত। পাশাপাশি মহাভারতেও উল্লেখিত হয়েছে এই মহাবীরের কথা।তিনি ছিলেন একধারে পরম রামভক্ত, মহাবীর যোদ্ধা, এবং ভগবানের প্রতি ভক্তির প্রতিভূ। নিজের হৃদয় বিদীর্ণ করে ভগবান শ্রীরাম ও মাতা সীতাকে প্রদর্শন করে তিনি আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি করার। তাছাড়া অনায়েসে বিশালাকার পর্বত ধারণ করা, সূর্যকে গ্রাস করা, এক লম্ফে সাগর পার করা এসকল অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন হনুমানরূপী মহাদেব। সনাতন ধর্মের সাতজন চীরঞ্জিবীর মধ্যে শ্রীহনুমান একজন। বলা হয় যেখানে যেখানে হরিনাম কীর্তন হয় , সেখানে তিনি সূক্ষ্মদেহে অবস্থান করেন। তাছাড়া শুধুমাত্র ভক্তি ও সমর্পণের বিনিময়ে মানুষের জীবনের সমস্ত সংকট দূর করেন সংকটমোচন শ্রীহনুমান। 

১২. কৃষ্ণদর্শন অবতার

সূর্যবংশীয় রাজা শ্রাদ্ধদেবের কনিষ্ঠ পুত্রের নাম ছিল নাভাগ।  নাভাগ যখন গুরুকূলে শিক্ষা গ্রহণ করছিলেন, তখন তার জ্যেষ্ঠ ভাইয়েরা পিতার সকল সম্পত্তি ভাগ করে নেয়। নাভাগ পিতৃগৃহে ফিরে দেখলেন তাঁর  অগ্রজ ভ্রাতারা সমস্ত পৈতৃক সম্পত্তি অধিকার করে নিয়েছেন। এবং তাঁর পিতা সংসার ত্যাগ করে বানপ্রস্থ অবলম্বন করেছেন। তবে নাভাগ এসকল পার্থিব সম্পদের মোহাবিষ্ট ছিলেন না। কারন তিনি ছিলেন শাস্ত্রজ্ঞানী ও উদার মানসিকতা সম্পন্ন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন পিতার সাথে অরণ্যে বসবাস করবেন এবং বাকী জীবন পিতার সেবা করে কাটিয়ে দেবেন। আর তাই অরণ্য মধ্যস্থ একটি নির্জন কুটিরে পিতার সাথে বসবাস করতে লাগলেন নাভাগ।

একদা নাভাগের পিতা আদেশ করলেন “এই অরণ্যে কিছু দূরে মহর্ষি আঙ্গিরস ও বৃদ্ধ ব্রাহ্মনেরা যজ্ঞ করছেন। যজ্ঞ সমাপন হলে যজ্ঞের অবশিষ্ট দ্রব্য নিয়ে এসো” নাভাগ পিতার আদেশ পালন করার জন্য সেই পবিত্র যজ্ঞভূমিতে গমন করলেন। এরপর যজ্ঞ সমাপন হলে তিনি উপস্থিত মুনি ঋষিদের কাছে নিজের পিতার আদেশ বর্ণনা করে যজ্ঞের অবশিষ্ট অংশ তাঁকে দান করার জন্য অনুরোধ করলেন। মুনি ঋষিরা নাভাগের পিতৃভক্তি ও ধর্মজ্ঞান দেখে প্রীত হয়ে নাভাগকে যজ্ঞাবিশিষ্ট নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। কিন্তু নাভাগ যখন যজ্ঞাবিশিষ্ট সংগ্রহ করতে যাচ্ছিলেন তখন সেখানে কৃষ্ণদর্শন অবতারে প্রকট হলেন দেবাদিদেব মহাদেব। তিনি নাভাগকে বললেন যজ্ঞের অবশিষ্ট অংশ রূদ্রের প্রাপ্য। এ তুমি নিতে পারো না। মুনি ও ব্রাহ্মণেরাও যজ্ঞের এই বিধান বিস্মৃত হয়েছিল।

তখন নাভাগ রুষ্ট না হয়ে নিজের ভুল স্বীকার করলেন এবং কৃষ্ণদর্শন অবতারকে পিতৃ আজ্ঞার কথা খুলে বললেন। নাভাগের এই সমর্পণ ও পিতৃভক্তির পরীক্ষা নিতেই এসেছিলেন মহাদেব। আর সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন নাভাগ। মহাদেব তাঁকে দর্শণ দিয়েছিলেন এবং তাঁর ধর্মজ্ঞান ও পিতৃভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে প্রাণ ভরে আশির্বাদ করেছিলেন। 

১৩. ভিক্ষুচার্য্য অবতার

একদা সত্যরথ নামের এক শিবভক্ত রাজা ছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তিনি এক যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন। তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী কোনমতে পেটের সন্তানকে নিয়ে পালায়ন করতে সক্ষম হলেন। কিন্তু জঙ্গলের মধ্যেই তাঁর প্রসব বেদনা শুরু হয় এবং সেখানেই তিনি এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। তবে সন্তান জন্মদান করার পরেই রানী নিজেও বন্য প্রাণির হাতে নিহত হন। ভাগ্যক্রমে নবজাতক শিশুটি জীবিত ছিল বটে তবে ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে উচ্চস্বরে ক্রন্দন করতে লাগল সে। ভাগ্যের পরিহাসে রাজপুত্র হয়েও সোনার দোলনায় না দুলে, রেশমি কাপড় না পরে অরণ্যে শুকনো পাতার উপরে গড়াগড়ি যাচ্ছিল শিশুটি।

এ দৃশ্য দেখে দয়া হল মহাদেবের। তিনি ভিক্ষুচার্য্য নামক এক ভিক্ষুক বেশ ধারণ করে সেই শিশুটিকে বন্যপশু থেকে রক্ষা করেন। এবং এরপর এক ভিখারিনীর কাছে শিশুটির পরিচয় জানিয়ে তাকে নিয়ে লালন পালন করার নির্দেশ দিলেন। ভিক্ষুচার্য্য অবতারে ভগবান শিব এই শিক্ষা দিলেন যে জগতের কেউই অনাথ নয়। অনাথের সাথেও সর্বদা ভোলানাথ আছেন, থাকবেন।

১৪. সুরেশ্বর অবতার

সুর শব্দের অর্থ হচ্ছে দেবতা এবং সুরেশ্বর শব্দ দ্বারা দেবতাদের কর্তা বা দেবরাজ ইন্দ্রকেই বোঝানো হয়ে থাকে। তো একদা উপমন্যু নামক এক পিতৃহীন বালক তাঁর দরিদ্র মাতার সাথে অরণ্যের মধ্যে একটি জীর্ণ কুটিরে বাস করতেন। তবে উপমন্যু ও তাঁর মাতা ছিলেন পরম শিবভক্ত। একদিন বালক উপমন্যু তাঁর মাতার কাছে গরুর দুধ পান করার আবদার করলেন। কিন্তু দরিদ্র মাতার পক্ষে যেখানে দুবেলা অন্নসংস্থান করা দুষ্কর সেখানে গোদুগ্ধ তো কল্পনাতীত ব্যাপার। কিন্তু নিষ্পাপ শিশুটি মনে কষ্ট পাবে বলে তাঁর মাতা উপমন্যুকে চাল ধোয়া জলকে দুধ বলে খেতে দিলেন। কিন্তু শিশু উপমন্যু বুঝতে পারলেন মাতা নিরুপায় হয়ে দুধের পরিবর্তে চাল ধোয়া জল তাঁকে পান করতে দিয়েছেন। তিনি মাতাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “মাতা আমরা কি কখনোই গোদুগ্ধ পান করতে পারবো না?”

উত্তরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মাতা বললেন, “হে পুত্র, তোমার অভাব একমাত্র মাতা পার্বতী ও দেবাদিদেব মহাদেবই নিরসন করতে পারেন। তাঁদের কৃপা ভিন্ন তোমার অদৃষ্টে গোদুগ্ধ নেই।” মাতার কথা শুনে শিশু উপমন্যু গৃহত্যাগ করে হাজির হলেন এক ভগ্ন শিবালয়ে। সেখানে পরম ভক্তিভরে ফুল-জল-বেলপাতা দিয়ে পূজা করতে লাগলেন মহাদেবের। কিছুকাল পর সুরেশ্বর তথা দেবরাজ ইন্দ্র উপস্থিত হলেন বালক উপমন্যুর সামনে। তিনি উপমন্যুকে বললেন “বৎস্য! তুমি ঐ ভিক্ষুকের উপাসনা ছেড়ে আমার তপস্যা করো। আমি তোমার সকল অভাব ঘুচিয়ে দেব। যে শ্মশানচারী মহেশ্বর নিজেই দীন হীন। সে আর তোমাকে কি দেবে?”

কিন্তু দেবরাজের মুখে এমন নোংরা শিবনিন্দা শুনে উপমন্যু তাঁর লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন এবং পুনরায় শিবের তপস্যায় রত হলেন। ঠিক তখনই দেবরাজ ইন্দ্র মিলিয়ে গিয়ে সেখানে আবির্ভূত হলেন হর-পার্বতী যুগল। তাঁদেরকে চাক্ষুষ দেখতে পেয়ে গোদুগ্ধের কথা ভুলেই গেলেন উপমন্যু। তখন  মহাদেব এই বালককে বললেন, “হে বালক, আমিই সুরেশ্বর রূপ ধারণ করে তোমাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেছিলাম। তোমার চাহিদা অতি সামান্য এবং অনেক কিছু পাওয়ার লোভে তুমি নিজের আরধ্যকে ভুলে যাও নি। আমি তোমাকে তোমার ঈপ্সিত গোদুগ্ধসহ তোমাকে ক্ষীরের সাগর উপহার দিলাম”। আর এভাবেই ভক্তি নিষ্ঠার কাছে আর একবার সুরেশ্বর রূপে ধরা দিয়েছিলেন মহাদেব।

১৫. কিরাত অবতার

কীরাতেশ্বর অবতারের উল্লেখ পাওয়া যায় মহাভারতে। পাণ্ডবগণ যখন বনবাস পালন করছিলেন তখন থেকেই তাঁরা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন একটি মহাযুদ্ধের সময় ক্রমশ সন্নিকটে এগিয়ে আসছে। তাই দেবব্যাসের পরামর্শে পাণ্ডবগণ অস্ত্র সংগ্রহে মনোনিবেশ করেছিলেন। তো অর্জুন চেয়েছিলেন মহাদেবের মহাশক্তিশালী পশুপাতাস্ত্র প্রাপ্ত করতে। আর তাই তিনি এক দূর্গম পাহাড়ের চুড়ায় দেবাদিদেব মহাদবের তপস্যায় রত হলেন। এভাবে কিছুকাল কেটে যাওয়ার পর একদিন অর্জুন তাঁর তপস্যার সময় একটি বন্য শূকরের উপস্থিতি টের পেলেন। তিনি ভাবলেন এই পশুটি হয়ত কোনভাবে তাঁর তপস্যা ভঙ্গ করতে এসেছে অথবা কোন অসুর শূকরের রূপ ধারণ করে অর্জুনকে প্রহার করতে এসেছে। তাই অর্জুন তাঁর তীর ধনুক হাতে নিয়ে সেই বন্য শূকরের দিকে একটি তীর নিক্ষেপ করলেন। কিন্তু পরক্ষনেই তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর কাছাকাছি জায়গা থেকে আরও একজন সেই শূকরের দিকে তীর নিক্ষেপ করেছে। পাশে তাকিয়ে দেখলেন একজন কিরাত উপজাতির দলপতি হাতে তীর ধনুক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। অর্জুনের বুঝতে দেরী হল না যে তাঁর সাথে সাথে এই ব্যক্তিও শূকরের দিকে তীর নিক্ষেপ করেছেন। তো তীরের আঘাতে যখন শূকরটির মৃত্যু হল তখন অর্জুন ও কিরাত দলপতি দুজনেই বাদানুবাদে লিপ্ত হলেন। দুজনেই শুকরটি বধ করার কৃতিত্ত্ব দাবী করলেন। এই বাদানুবাদ থেকে এক পর্যায়ে শুরু হল যুদ্ধ। কিরাত দলপতি ও অর্জুন দুজনেই সমানভাবে যুদ্ধ করলেন একে অপরের সাথে। এক পর্যায়ে কিরাতের রূপ ত্যাগ করে সেস্থলে আবির্ভূত হলেন মহাদেব। ফলে লজ্জিত হলেন অর্জুন, তিনি ক্ষমা ভিক্ষা করলেন মহাদেবের কাছে। মহাদেব বললেন, “তিনি আসলে দেখতে চেয়েছিলেন অর্জুন পশুপাতাস্ত্র ধারনের উপযুক্ত কিনা।” কারন এই মহা শক্তিশালী অস্ত্র মুহূর্তেই সমগ্র সৃষ্টির বিনাশ করে দিতে পারে। তাই এটি সঠিক ব্যাক্তির কাছে সোপর্দ করা না হলে ভয়ানক বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে। তো মহাদেবের সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন অর্জুন। যার ফলশ্রুতিতে তিনি অর্জুনকে দান করেছিলেন পশুপাতাস্ত্র। যা মন, কথা, দৃষ্টি ও বাণ দিয়ে প্রয়োগ করা যায়। তবে অর্জুন মহাভারতের যুদ্ধে এই অস্ত্র প্রয়োগ করেন নি।  আর কিরাত রূপ ধারন করে মহাদেব অর্জুনের সামনে প্রকট হয়েছিলেন বিধায় এই অবতারের নাম হয়েছিল কিরাতেশ্বর অবতার। 

আরও পড়ুনঃ  বর্বরিকঃ কৃষ্ণকে মস্তক উৎসর্গকারী শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ || খাটু শ্যামের কাহিনী ||

১৬. ব্রহ্মচারী অবতার

দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগের ঘটনা আপনারা আগেই শুনেছেন। কিন্তু ভগবতীর দেহত্যাগ মানেই তাঁর মৃত্যু নয়। আর তাই পরজন্মে হিমালয়ের কন্যা হিসেবে আবারও জন্মগ্রহণ করলেন সতী। তবে পূর্বজন্মের সতী পরজন্মে নাম ধারণ করলেন পার্বতী। তো দেবী পার্বতী তাঁর এ জন্মেও ভোলানাথকে স্বামীরূপে প্রাপ্ত করার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে পড়লেন। আর তাই এক নিবিড় তপোবনে ছোট্ট আশ্রম কুটির নির্মান করে দেবাদেবের তপস্যায় মগ্ন হলেন তিনি। কিছুকাল তপস্যা করার পর দেবী পার্বতীর সেই তপোবনে হাজির হলেন একজন ব্রহ্মচারী। তিনি রাজকুমারী পার্বতীকে বলে উঠলেন  “তুমি রাজকুমারী হয়ে ঐ ভিক্ষুককে বিবাহ করবে ? তুমি কি উন্মাদ হয়েছ? মহাদেবের কাছে আছেই বা কি ? সে নিজেই ছাই ভষ্ম মেখে এবং ব্যাঘ্রচর্ম পরে থাকে, তোমাকে কি পরাবে? তাঁর কোন আশ্রয় নেই বলেই সে শ্মশানবাসী, তোমাকে সে কোথায় রাখবে? হে কমলনয়না, তুমি কোথায় আর সেই শঙ্করই বা কোথায়? তোমার মুখ পূর্ণিমার চাঁদের মতো অতীব সুন্দর। আর শিবের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছো কখনো? তোমার মাথার খোঁপা সৌন্দর্য আবর্তিত, আর শিবের মাথায় সহস্র বছরের জটা। তোমার সারা গায়ে চন্দনের লেপন, কিন্তু শিবের সারা গায়ে ছাই ভষ্ম। তোমার গায়ে মণি মাণিক্য খচিত অলঙ্কারে পরিপূর্ণ আর শিবের অলংকার বলতে গলায় পচানো সাপ। তোমার সব আত্মীয় পরিজনরা রাজা রাজাধিরাজ। আর মহাদেবের পরিজন হল ভূত, পিশাচের দল। এমনকি তাঁর কণ্ঠও বিষে পূর্ণ। তাই তুমি বরং অন্য কোন দেবতাকে বিবাহ করো।

ব্রহ্মচারীর মুখে শিবের এই নিন্দা শুনে ক্রোধে ফুসে উঠলেন মাতা পার্বতী। তাই রেগে গিয়ে তিনি যখন ব্রহ্মচারীকে শাপ দিতে উদ্যত হলেন তখন সেই ব্রহ্মচারী ব্যক্তিটি পরিণত হলেন ভগবান শিবে। মূলত মাতা পার্বতীর পরীক্ষা নিতেই মহাদেব এই ব্রহ্মচারী অবতার ধারণ করেছিলেন। এবং বলাই বাহুল্য সেই পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন মাতা পার্বতী।

১৭. সুরানর্তক অবতার

ভগবান শিবকে বলা হয় আদিনট। তিনিই ভরতনাট্টম শাস্ত্রের জ্ঞান প্রদান করেছিলেন ভরত মুনিকে। আবার তিনিই নটেদের রাজা তথা ‘নটরাজ’। তো মাতা পার্বতী যখন ভগবান শিবকে সন্তুষ্ট করে পতিরূপে প্রার্থনা করেছিলেন তখন তিনি দেবাদিদেবকে অনুরোধ করেছিলেন “জাগতিক সকল নিয়ম মেনেই আপনি আমার পাণিগ্রহণ করবেন।” অর্থাৎ পার্বতী চেয়েছিলেন দেবাদিদেব তাঁর পিতা হিমালয়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই তাঁকে বিবাহ করবেন। তো পার্বতীর অনুরোধ অনুসারে ভগবান শিব সুরানর্তক অবতার ধারণ করে হিমালয়ের সভায় হাজির হলেন। সেখানে হাতে ডমরু নিয়ে এক অসাধারন নৃত্য পরিবেশন করলেন তিনি। তাঁর মোহনীয় নৃত্যকলার সম্মহনে নির্বাক হয়ে গেলেন সবাই। নৃত্য শেষে হিমালয় যখন সুরানর্তককে পুরষ্কার দেওয়ার ইচ্ছা পোষন করলেন তখন মহাদেব হিমালয় কন্যা পার্বতীকে স্ত্রী হিসেবে দাবী করলেন। মহাদেবের এই দাবীতে প্রথমে হিমালয় ক্ষুব্ধ হলেও পরবর্তীতে যখন সুরানর্তকের আসল পরিচয় জানতে পারলেন তখন তিনি ধন্য ধন্য করে তাঁর কন্যা পার্বতীকে শিবের হাতে তুলে দিলেন।

১৮. যক্ষেশ্বর অবতার

যক্ষেশ্বর অবতারের ঘটনাটি অনেকটা দেবী হৈমবতী উমা কর্তৃক দেবতাদের দর্প চূর্ণ করার মত। সমুদ্র মন্থনের পর উত্থিত অমৃত পান করে একদা দেবতারা অহংকারী হয়ে উঠেছিলেন। তারা দম্ভে মত্ত হয়ে নিজেদেরকেই সর্বেসর্বা ভাবতে বসেছিল। তখন ভগবান শিব তাদের দর্প চূর্ণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কারন দেবতারা এত দাম্ভিক হলে দেবতা আর অসুরের মধ্যে পার্থক্য কোথায় ? তো মহাদেব এক যক্ষের রূপ ধারণ করে দেবতাদের সামনে উপস্থিত হলেন তাঁদের দর্প চূর্ণ করার জন্য। তিনি প্রথমে বায়ুদেবের সামনে একটি তৃণখণ্ড রেখে তাঁকে বললেন, “হে বায়ুদেব আপনি তো সবকিছুই উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারেন, এই তৃণখণ্ডটি উড়িয়ে দেখান তো।” কিন্তু বায়ুদেব বহু চেষ্টা করেও সেই তৃণোখণ্ডটি চুল পরিমাণ নড়াতে পারেননি। একইভাবে তিনি অগ্নিদেব, বরুণদেব, সূর্যদেব, ইন্দ্রদেব প্রভৃতি দেবতাদের সামনে সেই তৃণখণ্ড রাখলেন এবং তাঁরাও সেই তৃণখণ্ডটির সামান্যতম ক্ষতিসাধন করতে পারেননি। এসময় যক্ষরূপী ভোলানাথ স্বরূপে আবির্ভূত হলেন দেবতাদের সামনে। আর দেবতারাও তাঁদের ভুল বুঝতে পেরে মহাদেবের কাছে ক্ষমা প্রার্থী হন। মহাদবে তখন দেবতাদের দাম্ভিকতা পরিত্যাগ করে তাঁদের নিজেদের উপরে অর্পিত দায়ীত্ব সুন্দরভাবে পালন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। দেবতাদের সামনে যক্ষ রূপে আবির্ভূত মহাদেবের এই অবতারকে বলা হয় যক্ষেশ্বর অবতার।

১৯. অবধূত অবতার

আপনারা জানেন দেবতাদের গুরু হচ্ছেন দেবগুরু বৃহস্পতি। তো একদা দেবরাজ ইন্দ্র মোহাবিষ্ট হয়ে তার গুরুদেব বৃহষ্পতিকে অপমান করেছিলেন। এর কিছুকাল পরে দেবাদিদেব মহাদেবের সাথে সাক্ষাৎ এর উদ্দেশ্যে দেবরাজ ইন্দ্র কৈলাসে যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু পথিমধ্যে তিনি দেখতে পেলেন একজন পাগল সন্যাসী তথা অবধূত পথ আটকে শুয়ে আছেন। দেবরাজ ইন্দ্র তাঁকে কড়া ভাষায় পথ ছেড়ে দিতে আদেশ করলেন। কিন্তু অবধূত নির্বিকার। কোন কথা না বলে তিনি নিজের মতই পথ আটকে শুয়ে রইলেন। এর ফলে ক্রোধের উদ্রেক ঘটল দেবরাজ ইন্দ্রের। তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁর বজ্রাস্ত্রকে আহবান করে অবদূতকে আঘাত করতে উদ্যত হলেন। আর ঠিক সেই সময় সেই অবদূত রূপান্তরিত হলেন দেবাদিদেব মহাদেবে। তিনি তাঁর তৃতীয় নয়ন উন্মীলন করে সেই নেত্রের অগ্নি দ্বারা দেবরাজ ইন্দ্রকে ভস্মীভূত করতে উদ্যত হলেন। এসময় দেবগুরু বৃহস্পতি ছুটে এসে মহাদেবের কাছে ইন্দ্রের জন্য ক্ষমা ভিক্ষা করেন এবং যে যাত্রা ইন্দ্রদেব মহাদেবের কোপানল থেকে রক্ষা পান। তবে মহাদবের সেই নয়নাগ্নি সমুদ্রে পতিত হয়ে সেখান জন্ম হয়েছিল জলন্ধর নামক এক অসুরের। একারনে বলা হয় কারও প্রতি ভগবান রুষ্ট হলে সই ব্যক্তির গুরু তাঁকে রক্ষা করতে পারেন, কিন্তু কোন ব্যাক্তির প্রতি যদি তাঁর গুরু রুষ্ট হন তাহলে ভগবানও তাঁকে রক্ষা করতে পারেন না। ভোলানাথ শিব ঠিক এই শিক্ষা প্রদান করার জন্য অবধূত অবতার ধারণ করেছিলেন।

এই ছিল শিব পুরাণে বর্ণিত মহাদেবের ১৯টি অবতারের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। তবে এর বাইরেও বিভিন্ন পুরাণে মহাদবের আরও বেশ কিছু অবতারের উল্লেখ রয়েছে। আপনাদের আগ্রহ থাকলে সেইসকল অবতারের কাহিনী নিয়ে আসব আগামী কোন এক পর্বে। হর হর মহদেব।

5/5 - (1 vote)

Leave a Reply