You are currently viewing মৃত্যুর পূর্বে যমরাজ আমাদেরকে পাঠান ৪টি চিঠি || 4 Letters of Yamraj before Death ||

মৃত্যুর পূর্বে যমরাজ আমাদেরকে পাঠান ৪টি চিঠি || 4 Letters of Yamraj before Death ||

সাধারণ মানুষের জীবনের সবচেয়ে আতঙ্কজনক ঘটনাটি হল মৃত্যু। জন্মের পর থেকেই প্রতিনিয়তই তিল তিল করে আমরা এগিয়ে যাই মৃত্যুর দিকে। আমরা কেউই জানি না, কবে, কখন, কোথায় যমদূতেরা এসে হাজির হবেন মহাপ্রস্থানের শমন নিয়ে। কিন্তু কেমন হত, যদি স্বয়ং যমরাজ চিঠি লিখে আমাদেরকে জানিয়ে দিতেন আমাদের মৃত্যুর সময়? বাস্তবে কি  এমন হওয়া সম্ভব? অবিশ্বাস্য মনে হলেও আসলেই কিন্তু সেটা সম্ভব। অপমৃত্যু ছাড়া প্রত্যেক ব্যাক্তির জীবনের মৃত্যু আসার আগে যমরাজ ৪টি চিঠি আমাদেরকে প্রেরণ করেন। কিন্তু কি লেখা থাকে সেই চিঠিতে? কেন আমরা অনেকেই সেই চিঠি পেয়েও তাঁর অর্থ বুঝতে পারি না? আসুন একটি কাহিনীর আলোকে জেনে নেওয়া যাক যমরাজের সেই চারটি চিঠির বৃত্তান্ত।

পৌরাণিক একটি রূপক কাহিনী থেকে জানা যায়, পুরাকালে  যমুনা নদীর তীরে অমৃত নামক এক ব্যক্তি বাস করতেন। এই ব্যাক্তি মৃত্যুকে একটু বেশীই ভয় পেতেন। সারাক্ষণ তিনি আচ্ছন্ন থাকতেন মৃত্যু চিন্তায়। কবে, কখন, কোথায়, কিভাবে তাঁর মৃত্যু হবে তা নিয়ে সর্বক্ষণ উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে সময় পার করতেন। সর্বক্ষণ মৃত্যু চিন্তা করার কারণে তিনি মৃত্যুর দেবতা যমরাজ, চিত্রগুপ্ত এবং যমদূতদের সম্পর্কে প্রভূত জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হলেন। এবং পরিশেষে বুঝতে পারলেন, একমাত্র মৃত্যুর দেবতা যমকে সন্তুষ্ট করতে পারলেই মৃত্যুকে জয় করে অমরত্ত্বের দিকে ধাবিত হতে পারবেন তিনি। তাই এবার তিনি শুরু করলেন যমরাজের কঠোর তপস্যা। তাঁর তপস্যার মধ্য দিয়ে কেটে গেল অনেকগুলো শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা। দীর্ঘদিন ধরে তপস্যা করার পরেও যমরাজের দেখা পেলেন না তিনি। তবে দমবার পাত্র নন তিনি, কারন মৃত্যুকে জয় করতেই হবে তাঁকে। তাই তাঁর যমরাজের প্রতি তাঁর সাধনাকে কঠোর থেকে কঠোরতর পর্যায়ে নিয়ে গেলেন তিনি। তাঁর এই দৃঢ় মনোবল দেখে সন্তুষ্ট হলেন স্বয়ং যমরাজ। অবশেষে তাঁর তপস্যাস্থলে প্রকট হলেন তিনি। বললেন, “হে অমৃত, আখি খোল, তোমার তপস্যা সফল হয়েছে। যদিও কোন জীবিত ব্যাক্তি আমার দর্শন লাভ করতে পারে না, তবুও তোমার ভক্তিতে খুশি হয়ে আমি নিয়ম ভেঙে তোমাকে দর্শন দিলাম।”

আরও পড়ুনঃ  মহর্ষি দধিচীর প্রকৃত পরিচয় ও আত্মত্যাগের কাহিনী || বজ্রসম কঠিন অস্থি যার || Mahrshi Dadhichi Story||

চোখ খুলে অমৃত দেখতে পেলেন স্বয়ং যমরাজ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর উদ্দেশ্যে আশির্বাদী মুদ্রা প্রদর্শন করছেন। এ দৃশ্য দেখে খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠলেন অমৃত। ভাবলেন, এবার আর তাঁর অমত হওয়াকে আটকায় কে। স্বয়ং মৃত্যুর দেবতা যমরাজ কে তিনি প্রসন্ন করেছেন। কাজেই তাঁর জীবন থেকে মৃত্যুকে বিলুপ্ত করে দেওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। যাইহোক, যমরাজের শান্ত মূর্তির সামনে ভক্তিভরে প্রণাম করলেন অমৃত। অমৃতের প্রণাম গ্রহণ করে যমরাজ বললেন, “হে অমৃত, তোমার ভক্তি অসাধ্য সাধন করেছে, আমাকে এনে দাঁড় করিয়েছে তোমার আঙিনায়। এবার বল, কি অভিপ্রায়ে তোমার এই কঠোর সাধনা? কি বর চাই তোমার?” ঠিক এই সময়টার অপেক্ষা করছিলেন অমৃত। তাই আর দেরী না করে বলে উঠলেন, “হে যমরাজ। আমার অত্যান্ত সৌভাগ্য যে আমি আপনার দর্শন লাভ করেছি। কিন্তু হে প্রভু জ্ঞান বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই একটি বিষয় আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। সেই যাতনা থেকে মুক্তি পেতেই আপনার শরনাপন্ন হয়েছি। আপনি দয়া করে আমকে সেই যাতনা থেকে মুক্ত করুন।”

যমরাজ বললেন, “বৎস অমৃত, কি তোমার সেই যাতনা আমাকে খুলে বলো। আমি নিশ্চই তোমাকে সেই যাতনা থেকে মুক্তি দিতে চেষ্টা করব।” অমৃত বললেন, “হে প্রভু, আমি সর্বদা মৃত্যু ভয়ে ভীত সন্ত্রস্থ থাকি। আপনি দয়া করে আমাকে অমরত্ত্ব দান করে আমার মৃত্যুভয় দূর করুন।” অমৃতের কথা শুনে মৃদু হাসলেন যমরাজ। তারপর বললেন, “হে অমৃত, মৃত্যুভীতি শুধু তোমার একার নয়, পার্থিব জীবদের বেশিরভাগই এই ভয়ে ভীত সর্বদা সন্ত্রস্থ থাকে। কিন্তু হে বৎস, মৃত্যু এই জগৎ সংসারের সবচেয়ে কঠিনতম সত্য। যোনীজাত যে কোন জীবকে অবশ্যই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। এটাই সংসারের নিয়ম। এবং কারও সাধ্য নেই এই নিয়মের ব্যাত্যয় ঘটানোর। সুতারাং তোমার এই চাওয়া পুরণ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে তোমার অন্য কোন প্রার্থনা থাকলে তা অবশ্যই আমি বিবেচনা করে দেখব।”

আরও পড়ুনঃ  ভাইফোঁটার পিছনের ৩ পৌরাণিক কাহিনী || ভাইফোঁটা || Bhai Phota || Bhai Dooj || Mythological Stories

এত কষ্টে যমরাজকে প্রসন্ন করে এবং তাঁর দর্শন প্রাপ্ত করেও নিজের আশা পূর্ণ হচ্ছে না দেখে অত্যন্ত নিরাশ হলেন অমৃত। এরপর হতাশ্চিত্তে বলে উঠলেন, “তাহলে হে প্রভু, তাহলে আমাকে অন্তত এই বর দিন যাতে আমি আমার আসন্ন মৃত্যু সম্পর্কে আগে থেকেই জানতে পারি। এরফলে আমি নিজেকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করতে পারবো।” যমরাজ বললেন, “ তথাস্তু। তোমার মৃত্যুর আগে আমি তোমাকে ৪টি চিঠি পাঠাবো। প্রথম চিঠিটি প্রাপ্তির পর থেকেই তুমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করবে। আশা করি এবার তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়েছে।” এই বলে অন্তর্হিত হলেন যমরাজ। আর অমৃতও নিশ্চিন্ত মনে ফিরে গেলেন তাঁর আপন গৃহে।

এরপর যমরাজের চিঠির অপেক্ষায় অমৃত নিশ্চিন্ত হয়ে ধর্মকর্ম সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে বিলাসব্যসনে মত্ত জীবনযাপন শুরু করলেন। তার আর কোনো চিন্তাই রইল না মৃত্যু নিয়ে। কারন তিনি মনে মনে নিশ্চিন্ত রইলেন যে, মৃত্যুর আগাম ইঙ্গিত হিসেবে যমরাজের কাছ থেকে তিনি নিশ্চয়ই ৪টি চিঠি পাবেন। এভাবে কাটল বেশ কিছুকাল। বয়স বাড়তে থাকল অমৃতের। একসময় তার মাথার চুল পাকল, বেশ কিছু দাঁত পড়ে গেল। কিন্তু অমৃত তখনও ঈশ্বর বিমুখ হয়ে নিশ্চিন্ত মনে ভোগ বিলাসে মত্ত। এর কিছুকাল পর চোখের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসা শুরু হলো তাঁর। এবং এক পর্যায়ে বয়সের ভারে একেবারে নিশ্চয় হয়ে গেলেন তিনি। কিন্তু তখনো তার কাছে যমরাজের কোনো চিঠি এসে পৌঁছল না । তাই অতি নিশ্চিন্ত হয়ে দিনযাপন করতে লাগলেন অমৃত।

কিন্তু একদিন রাত্রে হঠাৎ যমদূত এসে হাজির হলেন অমৃতের সামনে। এভাবে হঠাৎ যমদূতের আগমনে কিছুটা আশ্চর্য হলেও, অমৃত বুঝতে পারলেন, এবার তাঁর যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। এরপর তাঁর প্রাণ হরণ করে যমদূতেরা চললেন যমালয়ে। তখনও যমরাজের প্রতি ক্ষোভে ফুসছেন তিনি। কারন যমরাজ তাঁকে ৪টি চিঠি পাঠাবার কথা দিয়েও তাঁর কথা রাখেননি। এরপর যমালয়ে পৌছে যেইনা যমদূতেরা অমৃতকে যমরাজের সামনে হাজির করলেন, ওমনি যমরাজের প্রতি তাঁর সমস্ত  ক্ষোভ উগরে দিলেন তিনি। অমৃত বলে উঠলেন, “হে মৃত্যু দেবতা যমরাজ, আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন, আমার মৃত্যুর আগে আপনি আমাকে ৪টি চিঠি পাঠিয়ে সতর্ক করবেন এবং আমাকে মৃত্যুর প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করবেন। কিন্তু ৪টি তো দুরের কথা একটি চিঠিও আমি আপনার কাছ থেকে পাইনি। কথা দিয়েও কথা না রেখে আমার সাথে নিষ্ঠুর ছলনা করছেন আপনি। ”

আরও পড়ুনঃ  চিনে নিন আপনার বাড়ির কোন গাছগুলো শুভ এবং কোনগুলো বিপদজনক

এবারও অমৃতের কথা শুনে মৃদু হাসলেন যমরাজ। বললেন, “হে মূর্খ অমৃত, তুমি কি ভেবেছিলে, আমি কাগজের উপরে নিজে হাতে চিঠি লিখে তোমাকে পাঠাব? শোনো, তোমার শরীরই ছিল আমার কাগজ, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তোমার শারীরিক পরিবর্তনগুলো ছিল আমার কলম, আর সময় ছিল আমার বার্তাবাহক। আমি তোমাকে আমার কথামতো চারটি চিঠিই পাঠিয়েছিলাম। তোমার চুল পেকে যাওয়ার ঘটনা ছিল আমার প্রথম চিঠি, তোমার দাঁত পড়ে যাওয়ার ঘটনা আমার দ্বিতীয় চিঠি, যখন তোমার দৃষ্টিশক্তি কমে আসা শুরু হলো তখন তুমি পেলে আমার তৃতীয় চিঠি, আর চতুর্থ চিঠিটি তুমি পেয়েছিলে যখন তুমি অচল হয়ে গেলে। কিন্তু তোমার দুর্ভাগ্য, তুমি আমার পাঠানো একটি চিঠির পাঠোদ্ধার করতে পারোনি। আর হ্যাঁ, শুধু তুমি একা নও, সমগ্র মানবজাতি তথা জীবজগতের প্রত্যেকের জন্যই আমি এই ৪টি চিঠি পাঠিয়ে থাকি। কিন্তু আফসোস, তোমার মত মূর্খেরা কখনোই সেগুলোর অর্থ বুঝতে পারে না।”

যমরাজের কথা শুনে লজ্জায় মস্তক আনত হল অমৃতের। তিনি বুঝতে পারলেন, যমরাজ কোন পার্থিব চিঠির কথা বলেননি। কিন্তু পার্থিব বিলাসব্যসনে মত্ত হয়ে তা কখনোই তাঁর মাথায় আসে নি। তাঁর ফল স্বরূপ তাঁকে আজ ঈশ্বরবিমূখ অবস্থাতেই প্রাণত্যাগ করতে হল।

সুতরাং, সনাতন বিশ্বাস অনুসারে, মৃত্যুর আগে যেকোনো মানুষই এই চারটি চিঠি পেয়ে থাকেন এবং প্রথম চিঠিটি পাওয়ার পর থেকেই নিজেকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রে। মানবদেহের বয়সোচিত ক্ষয়ই যে তার মৃত্যুর পূর্বাভাস এই সত্যকেই নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেছে পুরাণের এই রূপকধর্মী কাহিনীটি।

5/5 - (1 vote)

Leave a Reply