You are currently viewing মহাভারতের শহরগুলো / স্থানসমূহ এখন কোথায়?  Present Locations of Cities Mentioned in Mahabharat.

মহাভারতের শহরগুলো / স্থানসমূহ এখন কোথায়? Present Locations of Cities Mentioned in Mahabharat.

বিশ্বের বৃহত্তম মহাকাব্যের নাম মহাভারত। এই মহাকাব্যের পাতায় পাতায় চিত্রিত হয়েছে কৌরব ও পাণ্ডবদের গৃহবিবাদ, ঘাত-প্রতিঘাত, সংকট – উত্তরণ, শোষন-বঞ্চনা ও ধর্ম-অধর্মের চর্চা যা পরিনতি পেয়েছিল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ময়দানে। তবে মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস রচিত এই মহাকাব্যকে অনেকেই নিছক পৌরাণিক বা কাল্পনিক কাহিনী ভেবে ভুল করে বসেন। বস্তুত মহাভারতের প্রত্যকটি চরিত্র, স্থান ও কাল সম্পূর্ণরুপে বাস্তব। সাম্প্রতিক প্রতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও ইতিহাসবিদদের গবেষনায় প্রমাণিত হয়েছে মহাভারত কেন্দ্রিক প্রত্যেকটি ব্যাক্তি, বস্তু, স্থান ও মহাভারতের যুগের অস্তিত্ত্ব। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কথাই ধরা যাক। বৈজ্ঞানিক গবেষনায় দেখা গেছে  খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৮ অব্দে অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৫০০০ বছর আগে সংগঠিত হয়েছিল স্মরণকালের সর্ববৃহৎ এই ধর্মযুদ্ধটি। শুধু তাই নয়, কালের বিবর্তনে জ্ঞান-বিজ্ঞানও এগিয়ে গেছে বহুদুর। এর ফলে ক্রমান্বয়ে চিহ্নিত ও আবিষ্কৃত হয়েছে মহাভারতের যুগের সেই গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো। আজ সনাতন এক্সপ্রেসের দর্শকদের জন্য রইল মহাভারতের যুগের সেই ঐতিহাসিক স্থানগুলোর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য। আশা করি এ যাত্রার শেষ পর্যন্ত আমাদের সাথেই থাকবেন।

গান্ধার

মহাভারতে উল্লেখিত গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গান্ধার। মহাভারতের তথ্য অনুসারে গান্ধার রাজ্যের তৎকালীন রাজা সুবলের কন্যা গান্ধারীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন কুরুরাজ্যের মহারাজ জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্র। কিছুটা চাপের মুখে তথা ভীষ্মের প্রবল পরাক্রমের ভয়ে জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্রের সাথে বিবাহ সম্বন্ধে রাজি হয়েছিলেন গান্ধারী। রাজা সুবল ও রাজকুমার শকুনিও এই একই কারনে তাঁদের কন্যা ও ভগিনীর বিবাহে দ্বিমত পোষন করেননি। পরবর্তীতে এই শকুনিই হয়ে ওঠেন কুরুরাজ্য পতনের অন্যতম প্রধান কারন।  মহাভারতের বর্ননার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে গেলে, সিন্ধুনদের পশ্চিম তীর হতে আফগানিস্তের অধিকাংশ অঞ্চলকে প্রাচীনকালে গান্ধার দেশ নামে ডাকা হত। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে আফগানিস্তানের কান্দাহার শহরটিই হল প্রাচীন গান্ধার নগরী। এটি আজ ভারতবর্ষের থেকে আলাদা একটি ভূখণ্ড হিসেবে পরিগণিত হলেও, একসময় এটিই ছিল আর্যাবর্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ নগরী।

গান্ধার
গান্ধার

তক্ষশীলা

মহাভারত অনুসারে তক্ষশীলা ছিল তৎকালীন গান্ধার রাজ্যের রাজধানী। পাণ্ডবদের উত্তরাধিকারী পরীক্ষিতকে এই তক্ষশীলার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে হিমালয় যাত্রা করেছিলেন পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী।কিন্তু রাজা পরিক্ষিত শমীক মুনিকে অপদস্ত করার জেরে মুনিপুত্র শৃঙ্গের দ্বারা নাগ দংশনে মৃত্যু হওয়ার অভিশাপ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। এর ফলে সুরক্ষিত প্রাসাদের ভিতরে তক্ষক নাগ ব্রাহ্মন বেশে প্রবেশ করে সগর্জনে তাকে দংশন করেন। এরপর পরিক্ষীত পুত্র জনমেজয় এই তক্ষশীলাতেই সর্পসত্র যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন তক্ষককে হত্যা করার উদ্দেশ্যে। এ যজ্ঞে বহু সর্প নিধনও করেছিলেন জনমেজয় তবে তক্ষককে নিধন করার উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বর্তমানে পাকিস্তানের রওয়ালপিন্ডিতে এই শহরের অবস্থান। মহাভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হওয়ার পাশাপাশি এখানে রয়েছে পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়। আবার ঋষি উদ্দালক বা অরুণি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন বলেও মতামত প্রদান করেন অনেক বিশেষজ্ঞরা। বলা হয় এখানেই কৌটিল্য তথা চাণক্য তাঁর অর্থশাস্ত্রের রচনা করেছিলেন। কিংবদন্তী রয়েছে, রাজা বিম্বিসার ও বুদ্ধের ব্যক্তিগত চিকিৎসক জীবক এখানেই চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন।

তক্ষশীলা
তক্ষশীলা

হস্তিনাপুর

হস্তিনাপুর নগরীকে আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেওয়া একেবারেই অনাবশ্যক। মহাভারতের কুরুপাণ্ডবদের, দন্দ্ব-সংঘাত, উত্থান-পতন ও নানা নাটকীয়তা আবর্তিত হয়েছে এই হস্তিনাপুরের রাজ সিংহাসনকে কেন্দ্র করে। মহারাজ শান্তনু থেকে শুরু করে পিতামহ ভীষ্ম, ধৃতরাষ্ট্র-পাণ্ডু, দুর্যোধন ও শত কৌরব এবং পাণ্ডবদের স্মৃতিবিজড়িত হস্তিনাপুর শহরটি আজ কয়েক হাজার বছর পরেও মানচিত্র থেকে হারিয়ে যায়নি। একাধিক প্রত্নত্বাত্তিক অনুসন্ধানে ও গবেষনায় প্রমানিত হয়েছে ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের মিরাট জেলায় গঙ্গার একটি পুরনো উপত্যকার তীরে অবস্থিত শহরটিই হচ্ছে মহাভারতের হস্তিনাপুর। তবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি জৈন সম্প্রদায়ের মানুষের কাছেও এটি একটি পবিত্র তীর্থস্থান। তাছাড়া এখানে অবস্থিত পান্ডেশ্বর মন্দির, কর্ণ মন্দির সহ অনেক সুপ্রাচীন মন্দির এই স্থানকে মহাভারত যুগের সুপষ্ট প্রমান হিসেবে উপস্থাপন করে যাচ্ছে। এছাড়াও জৈন সম্প্রদায়ের বেশ কিছু মন্দিরের উপস্থিতি এস্থানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

আরও পড়ুনঃ  সহজভাবে ও শুদ্ধভাবে গীতা পাঠ করার নিয়ম / উপায় || গীতার ১৮ টি নাম মাহাত্ম্য || গীতাপাঠের ফল।
হস্তিনাপুর
হস্তিনাপুর

মদ্র দেশ

মহাভারতের যুগে মদ্র দেশের রাজা ছিলেন মহারাজ শল্য। মহারাজ পাণ্ডু মদ্র দেশের রাজকুমারী তথা মহারাজ শল্যের ভগিনী মাদ্রীকে দ্বিতীয়া স্ত্রী হিসেবে বিবাহ করেছিলেন। মাদ্রী ও পাণ্ডু দুর্বাসাপ্রদত্ত পুত্রেষ্টিমন্ত্রের মাধ্যমে ও অশ্বিনীকুমারদ্বয়য়ের ঔরসে নকুল ও সহদেব নামক জমজ সন্তান লাভ করেছিলেন। তাই মদ্রদেশ ছিল নকুল ও সহদেবের মাতুলালয় বা মামার বাড়ি।

মহাভারত ছাড়াও গড়ুরপুরাণ, মৎসপুরাণ ও ব্রহ্মাণ্ডপুরাণেও এই মদ্রদেশের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এই দেশের বর্তমান অবস্থান নিয়ে প্রায় চারটি মত প্রচলিত। সাধারন মতে  পাঞ্জাবের অন্তর্গত ইরাবতী ও চন্দ্রভাগা নদীর মধ্যবর্তী প্রাচীন দেশটিই হচ্ছে মদ্রদেশ। দ্বিতীয় মতে বিরাট ও পাণ্ড্যরাজ্যের মধ্যবর্তী, পূর্ব-দক্ষিণে বিস্তৃত জনপদই ছিল মদ্রদেশ। আবার তৃতীয় মতে বর্তমানের মাদ্রাজই হচ্ছে প্রাচীন মদ্র জনপদ। মদ্ররাজের নামানুসারেই মাদ্রাজ নামের উৎপত্তি বলে ধারনা করা হয়। পাশাপাশি আরও একটি মত বলছে বর্তমানে নেপাল এবং ভারতের একাংশে অবস্থান ছিল প্রাচীন মদ্রদেশের।

মথুরা
মথুরা

ইন্দ্রপ্রস্থ

ইন্দ্রপ্রস্থ হচ্ছে মহাভারতের যুগে নির্মিত পাণ্ডবদের রাজ্যের রাজধানী। যমুনা তীরবর্তী খান্ডব নামক অরণ্যভুমি দহন করে এই ইন্দ্রপ্রস্থ নির্মাণ করা হয়েছিল বলে এই স্থানকে খাণ্ডবপ্রস্থ বলেও ডাকা হয়। পদ্মপুরাণ বলছে, দেবরাজ ইন্দ্র এই স্থানে নানাবিধ যাগযজ্ঞ করেছিলেন, এবং সেই যজ্ঞে উপস্থিত ব্রাহ্মন দেবতাদেরকে বহুবিধ স্বর্ণও দান করেছিলেন। তাঁর ফলে এই স্থানের নাম হয়েছিল ইন্দ্রপ্রস্থ।  মহাভারত অনুসারে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র নিজ পুত্রদের থেকে পাণ্ডবদের দূরে রাখতে এই ভূখন্ডে রাজত্ব দান করেন। মূলত পাণ্ডবদের রাজ্যাধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্যই রচিত হয়েছিল এই কূটকৌশল। পাণ্ডবগন ও শ্রীকৃষ্ণ অগ্নিদেবের সহায়তায় খাণ্ডব দহন করা শুরু করলেন তাঁদের নতুন রাজধানী স্থাপন করার জন্য। এসময় ময়দানব কে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন অর্জুন। এই ময়দানব ছিলেন দানব সমাজের বিশ্বকর্মাতুল্য। তিনি তাঁর প্রাণ বাচানোর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ পাণ্ডবগণকে ইন্দ্রপ্রস্থ নির্মান করতে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করেছিলেন। নির্মাণকৌশলের নৈপুণ্যে সূর্যের প্রখর তাপেও ইন্দ্রপ্রস্থের ভেতর থাকত ঠাণ্ডা। এর বাইরে খনন করা হয়েছিল বিরাট পরিখা যাতে শত্রুর আক্রমণ থেকে নগরকে সুরক্ষিত রাখা যায়। ইন্দ্রপ্রস্থের সীমানা প্রাচীর ছিল এমন যাতে চাঁদের আলো পড়লে মনেহয় মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। প্রাসাদের ভেতরে ছিল স্ফটিকের মতো জলাশয় । দুর্যোধন এই জলাশয় দেখে বুঝতে না তাতে পতিত হয়েছিলেন এবং তাই দেখে দ্রৌপদী ব্যঙ্গের হাসি হেসেছিলেন। মূলত এই অপমানের বদলা নিতেই ক্রোধান্বিত দুর্যোধন হস্তিনাপুর ফিরে গিয়ে পাশাখেলার কুমন্ত্রণা করেছিলেন। মায়াময় সেই ইন্দ্রপ্রস্থ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে বহু আগেই। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষনা ও ঐতিহাসিকগণের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আজকের দিল্লী শহরটিই হচ্ছে মহাভারতে বর্ণিত সেই অপরূপ শহর।

ইন্দ্রপ্রস্থ
ইন্দ্রপ্রস্থ

দ্বারকা

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মামা কংস ছিলেন তৎকালীন মথুরার অত্যাচারী রাজা। এই অত্যাচারী রাজাকে বধ করেছিলেন স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। কংসের এহেন মৃত্যু কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি তাঁর শ্বশুর জরাসন্ধ। জরাসন্ধ ছিলেন প্রবল বাহুবল ও রণনৈপুণ্যের অধিকারী। এছাড়াও তাঁর বিপুল পরিমান সৈন্যসংখ্যা তাঁকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল। এই জরাসন্ধ তাঁর জামাতা কংসের মৃত্যসংবাদ শুনে প্রতিশোধপরায়ন হয়ে মথুরা আক্রমন করেন। কিন্তু ১৭ বার মথুরা আক্রমণের পরও জরাসন্ধ মথুরা জয় করতে ব্যর্থ হন। তবে এই ১৭ বার আক্রমণে মথুরার অধিবাসী যাদবরা দুর্বল হয়ে পড়েন। শ্রীকৃষ্ণ যখন বুঝতে পারেন জরাসন্ধ আর একবার আক্রমণ করলে তা প্রতিরোধ করার শক্তি যাদবদের নেই, তখন তিনি নতুন এক শহর প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন বোধ করেন। নতুন এই শহর প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রীকৃষ্ণ দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার সাহায্য নেন। বিশ্বকর্মা শ্রীকৃষ্ণকে নতুন  শহর প্রতিষ্ঠা করার জন্য সমুদ্রদেবের কাছে ভূমি আহবান করার অনুরোধ জানান। অবশেষে শ্রীকৃষ্ণের আহবানে সমুদ্রদেব শ্রীকৃষ্ণকে ১২ যোজন ভুমি দান করেন। এবং এই ভূমিতেই নির্মিত হয় শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা নগরী।

আরও পড়ুনঃ  রামায়ণ থেকে মহাভারত পর্যন্ত জীবিত ছিলেন এই ৬ জন || People Who Lived Across Treta to Dwapara Yuga ||

শ্রীকৃষ্ণের সেই দ্বারকা নগরী বর্তমানে ভারতের উত্তর-পশ্চিমের রাজ্য গুজরাটের একটি শহর। এই দ্বারকা শহরে পরিচালিত একটি প্রত্নতাত্ত্বীয় অভিযানের মাধ্যমে সমুদ্রের প্রায় ৩৬ মিটার নিচে আবিষ্কৃত হয় প্রাচীন এক নগরীর ধ্বংসাবশেষ। এই নগরীর স্থাপত্যশিল্প, পাথর দ্বারা নির্মিত বিভিন্ন আকারের নোঙর, ভবন ও দুর্গ তৈরিতে ব্যবহৃত নানা পাথরের ব্লক পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই নগরী নির্মিত হয়েছিল আনুমানিক মহাভারতের যুগে।

দ্বারকা
দ্বারকা

মগধ

মহাভারতে অন্যতম প্রসিদ্ধ রাজ্য হচ্ছে মগধ। এটি ভারতের ষোলটি মহাজনপদ বা অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম। এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মহারাজ বৃহদ্রথ। তাঁর দুই পত্নী ঋষি চন্দকৌশিক এর আশির্বাদে সন্তান প্রসব করেছিলেন। তবে তাঁরা যে সন্তান প্রসব করেছিলেন তা ছিল অর্ধেক। অর্থাৎ দুই রানী একই সন্তানের অর্ধেক করে প্রসব করেছিলেন। এসময় জরা নামক এক রাক্ষসী এই দুটি অর্ধাংশ জুড়ে দেন। এর ফলে এই রাজকুমারের নাম হয়েছিল জরাসন্ধ। একইসাথে জরাসন্ধ বরপ্রাপ্ত হয়েছিলেন যে তাঁকে আপাদমস্তক ছেদন না করা পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হবে না। রাজা হিসেবে জরাসন্ধ ছিলেন প্রবল পরাক্রমশালী ও মহাবলি। তাঁকে বধ করার জন্য দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে তাঁর কুস্তির আখড়ায় জরাসন্ধকে উলম্বভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেন।

প্রাচীন মগধ রাজ্য বর্তমান বিহারের পাটনা, গয়া আর বাংলার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত ছিল। রাজা বিম্বসার ছিলেন মগধের প্রথম ঐতিহাসিক রাজা। বেশ কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞগণ জরাসন্ধের সেই আখড়ার বর্তমান অবস্থান হিসেবে বিহারের রাজগীর নামক স্থানকে চিহ্নিত করেছেন।

মগধ
মগধ

মৎস্যদেশ

মহাভারতের বিরাট পর্বে যে মৎস্যদেশের কথা বলা হয়েছে সেদেশের রাজা ছিলেন মৎসরাজ বিরাট। মহারাজ বিরাটের নামানুসারে এই রাজ্যকে বিরাট রাজ্যও বলা হয়ে থাকে। মৎস্যদেশ তথা বিরাটরাজ্য ছিল পাণ্ডবদের একটি মিত্রদেশ। ১২ বছর নির্বাসনের পর এখানেই ছদ্মবেশে এক বছর অজ্ঞাতবাস পার করেছিলেন পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী। যুধিষ্ঠির ছিলেন বিরাট রাজের পাশা খেলার সাথী, ভীম ছিলেন পাচক, অর্জুন বৃহন্নলারূপে দায়িত্ব নিয়েছিলেন রাজকুমারী উত্তরার নৃত্য ও সঙ্গীতকলা শেখানোর, গো-শালার দায়িত্বে ছিলেন সহদেব, এবং অশ্বশালার দায়িত্বে ছিলেন নকুল। পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী এখানে অজ্ঞাতবাস করছেন অনুমান করে দুর্যোধন এই বিরাট রাজ্য আক্রমন করেছিলেন। কিন্তু সেসময় বিরাটের সমস্ত সৈন্য দক্ষিণে অন্য এক যুদ্ধে ব্যাস্ত ছিল। অবস্থা বেগতিক দেখে বিরাট রাজের পুত্র রাজকুমার উত্তর বৃহন্নলারূপী অর্জুনকে সঙ্গে নিয়ে মোকাবেলা করেছিলেন হস্তিনাপুরের বিরাট সৈন্যবহরের। এবং বলাই বাহুল্য সে যাত্রা অর্জুনের রণনৈপুণ্যে পরাজিত হয়েছিলেন হস্তিপুরের সুপ্রশিক্ষিত সৈন্যদল।

বর্তমানে বিরাট রাজ্যের অবস্থান নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষন করেছেন গবেষকগণ। একটি মত বলছে মৎস্যদেশ বা বিরাট রাজ্যের বর্তমান অবস্থান রাজস্থানের জয়পুর জেলায়। মৎস্যরাজ বিরাটের নামানুসারে এই জয়পুরের বিরাট বা বিরাটনগর শহরটির নামকরণ করা হয়েছে। অন্য একটি মত বলছে বিরাট রাজার গোধন তথা গাভীর সংখ্যা ছিল বিপুল। তবে মাঝে মধ্যেই ডাকাতরা আক্রমন করে গাভী নিয়ে পালিয়ে যেত। তাই রাজা নদীর তীরবর্তী একটি সুরক্ষিত স্থানে তাঁর গাভীগুলোকে বেধে রাখতেন। এরপর পরবর্তিতে এই স্থানের নাম হয় গাইবাধা এবং তারপর গাইবান্ধা। বর্তমানে এই গাইবান্ধা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি জেলা। বিশেষজ্ঞগণের ধারনা গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ এলাকায় বিরাট জনপদের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল।

মৎস্যদেশ বা বিরাট রাজ্য
মৎস্যদেশ বা বিরাট রাজ্য

পাঞ্চাল

মহাভারতের যুগে উত্তর ভারতের গাঙ্গেয় উপত্যকার তীরে যে প্রাচীন জনপদ গড়ে উঠেছিল সেটি হচ্ছে পাঞ্চাল। এর ছিল উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা। পাঞ্চাল রাজ্যের সাথে জড়িয়ে আছে মহারাজ দ্রুপদ, পঞ্চপাণ্ডবদের পত্নী দ্রৌপদী, শিখণ্ডী এবং ধৃষ্টদ্যুম্নের নাম। মহাভারত অনুসারে জানা যায়, গুরু দ্রোণাচার্যকে তাঁর শিষ্যরা গুরু দক্ষিণা দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত পাঞ্চাল রাজ্য অখণ্ড অবস্থায় ছিল। দ্রোনাচার্যের শিষ্যগণ ও দ্রুপদের মধ্যকার যুদ্ধে দারুনভাবে পরাজিত হয়েছিলেন পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ। কিন্তু দ্রোনাচার্য সম্পূর্ণ রাজ্য জয় করেও গুরুভাই দ্রুপদকে অর্ধেক পাঞ্চাল তথা দক্ষিণ পাঞ্চাল রাজ্যের রাজ্যভার প্রদান করেন। অন্যদিকে দ্রোন পুত্র অশ্বত্থামা উত্তর পাঞ্চালের রাজা নিযুক্ত হন। অনুমান করা হয় বর্তমানে উত্তরাখণ্ড ও উত্তরপ্রদেশের কিছু অংশ জুড়ে ছিল পাঞ্চাল রাজ্যের অবস্থান। আবার কোন কোন মতে আজকের পাঞ্জাবই হচ্ছে মহাভারতের পাঞ্চাল রাজ্য।

আরও পড়ুনঃ  শ্রীকৃষ্ণ কেন কালী রূপ ধারন করেছিলেন? Why Shri Krishna Took the Form of Goddess Kali?

পাঞ্চাল

চেদি রাজ্য

চেদি রাজ্যের অন্যতম নৃশংস রাজা ছিলেন শিশুপাল। সম্পর্কে তিনি শ্রীকৃষ্ণের পিসতুতো ভাই হলেও তার সখ্যতা ছিল জরাসন্ধ ও দুর্যোধনের সাথে। চেদিরাজ শিশুপালের মাতা  শ্রুতকীর্তিকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কথা দিয়েছিলেন যে, তিনি শিশুপালের ১০০টি অপরাধ ক্ষমা করবেন। বচন অনুযায়ী ১০০টি অপরাধ ক্ষমাও করেছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। কিন্তু তাঁর শেষ পরিনতি ছিল সন্নিকটে। রাজসূয় যজ্ঞে যুধিষ্ঠিরের বিজয় হলে পাণ্ডবদের রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে শ্রীকৃষ্ণকে বিশেষ সম্মান দিতে গেলে চেদিরাজ শ্রীকৃষ্ণের এর তুচ্ছাত্মক বিরোধিতা করেন এবং পিতামহ ভীষ্মকেও বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে অপদস্ত করেন। এর ফলশ্রুতিতে শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন চক্রে প্রাণ হারান তিনি।

তৎকালীন সেই চেদি রাজ্যের কিছু অংশ বর্তমান উত্তর প্রদেশে এবং বাকি অংশ মধ্যপ্রদেশে অবস্থিত। এবং চেদি রাজ্যের রাজধানী শুক্তিমতী বর্তমান উত্তর প্রদেশের বান্দা শহরে অবস্থিত।

চেদি রাজ্য
চেদি রাজ্য

নিষাদ রাজ্য

প্রাচীন ভারতে নিষাদগণ ছিলেন ব্যাধ বা মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের মানুষ। নিষাদ রাজ্যের রাজকুমার ছিলেন একলব্য। পৃথিবীতে যখন যখন গুরুদক্ষিণা শব্দটি উচ্চারিত হয় তখনই সর্বাগ্রে নিষাদপুত্র একলব্যের নামটিও উচারিত হয়। এর কারনও আমাদের অজানা নয়। ধণুর্বিদ্যায় অতুলনীয় প্রতিভাশালী একলব্য দ্রোনাচার্যকে গুরু মেনে এবং তাঁর প্রতিকৃতি নির্মান করে ধণুর্বিদ্যা অধ্যয়ন করতেন। কালক্রমে গুরু দ্রোনাচার্য এই দৃশ্যের সাক্ষী হন। একলব্যের গুরুভক্তি ও পরাক্রম দেখে গুরু দ্রোণ মনে মনে সন্তুষ্ট হলেও অর্জুনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন ধণুর্বিদ তৈরি হোক তা তিনি চাননি। তাই গুরুদক্ষিণা হিসেবে চেয়েছিলেন একলব্যের ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলিটিকে। আর এলকব্যও তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি দান করে একটি বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছিলেন মহাভারত গ্রন্থে।

এই নিষাদদের অবস্থান ছিল তৎকালীন দক্ষিণ পাঞ্চালের দক্ষিণ-পশ্চিমে। তবে বর্তমানে নিষাদ রাজ্যের প্রকৃত অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছে রাজেস্থানে।

নিষাদ রাজ্য
নিষাদ রাজ্য

কুরুক্ষেত্র

সমগ্র মহাভারত জুড়ে বহুল চর্চিত শব্দটি হচ্ছে কুরুক্ষেত্র। আপনারা সকলেই জানেন, এই স্থানেই সংগঠিত হয়েছিল সর্বকালের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। মাত্র আঠারো দিনেই অগণিত যোদ্ধা দেহত্যাগ করেছিলেন এই রণভূমিতে। এই কুরুক্ষেত্রেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মুখনিঃসৃত বানীর সংকলন তথা শ্রীমদভগবত গীতা উপহার দিয়েছিলেন সমগ্র মানব জাতিকে। তাই রক্তস্নাত এই ধর্মযুদ্ধক্ষেত্র সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক মহাপবিত্র তীর্থস্থান।

বর্তমান ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের কুরুক্ষেত্র জেলার থানেশ্বরের দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মের স্পর্শধন্য সেই কুরুক্ষেত্র। প্রত্নতত্ত্ব বিশারদগণ ও ঐতিহাসিকদের গবেষনায় প্রমাণিত হয়েছে এটিই সেই কুরুক্ষেত্র যেখানে কুরু-পাণ্ডবদের মহারণ সংগঠিত হয়েছিল মহাভারতের যুগে। এছাড়াও মহাভারতের যুগের প্রমান হিসেবে এখানে দেখা মেলে ব্রহ্ম সরোবরের। এই সরোবরেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষ দিনে দুর্যোধন আত্মগোপন করেছিলেন। পাশাপাশি  কুরুক্ষেত্র প্যানোরামা এবং বিজ্ঞানমঞ্চ, ও ধরোহর যাদুঘরেও দেখা মেলে মহাভারতের যুগের প্রাচীন প্রমানপত্র। আবার কুরুক্ষেত্রের প্বার্শবর্তী জ্যোতিসার নামক স্থানটিও তীর্থযাত্রীদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারন এখানকার একটি বটগাছতলায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ভাগবতগীতার বাণী উপহার দিয়েছিলেন।

কুরুক্ষেত্র
কুরুক্ষেত্র

 

এছাড়াও অঙ্গরাজ্য তথা সুর্যপুত্র কর্ণের রাজ্যের বর্তমান অবস্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয় দক্ষিণ-পশ্চিম বিহার, ঝাড়খন্ড এবং পশ্চিমবঙ্গের কিছুটা অঞ্চলকে। সুরসেন রাজ্যে জন্মগ্রহন করেছিলেন স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যার রাজধানী ছিল মথুরা। এই রাজ্যটি বর্তমানে উত্তর প্রদেশের অন্তর্গত। কুন্তিভোজ ছিল মহারাজ পাণ্ডুর প্রথমা স্ত্রী কুন্তির জন্মস্থান। অর্থাৎ, যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুনের মাতুলালয় ছিল এই কুন্তিভোজ রাজ্যে। এই রাজ্যটি বর্তমানে রাজস্থানের অন্তর্গত বলে ধারণা করা হয়। এছাড়াও মহাভারতে অম্বা, অম্বিকা আর অম্বালিকা কাশীর রাজকন্যা হিসেবে উল্লেখিত। কাশীর রাজধানী ছিল কাশীপুর। যা বর্তমানে বারাণসী নামে সমধিক পরিচিত। উত্তর প্রদেশের অন্তর্গত এই রাজ্যটি আজও গঙ্গা নদীর অববাহিকায় অবস্থান করছে।

এবার আপনারাই বলুন, মহাভারতকে পৌরাণিক বা কাল্পনিক গাঁথা হিসেবে মূল্যায়ন করা ঠিক নাকি ভুল?

5/5 - (1 vote)

Leave a Reply