You are currently viewing বর্বরিকঃ কৃষ্ণকে মস্তক উৎসর্গকারী শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ || খাটু শ্যামের কাহিনী ||

বর্বরিকঃ কৃষ্ণকে মস্তক উৎসর্গকারী শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ || খাটু শ্যামের কাহিনী ||

প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের কথা। আর্যাবর্তে মহাসমারোহে আয়োজন চলছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের। বড় বড় রথী মহারথীরা এই যুদ্ধে নাম লিখিয়েছিলেন পাণ্ডব অথবা কৌরবদের পক্ষে। দুইপক্ষে লড়বেন দুই মহারথী ধণুর্ধর ও সহোদর ভ্রাতা, কর্ণ ও অর্জুন। পাণ্ডবপক্ষে আছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ , তবে তিনি অস্ত্র ধারন করবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারন তার সুদর্শন চক্র দিয়ে প্রহার করলে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নিমেষেই শেষ হয়ে যাবে। তাছাড়া অন্যান্য বীর- মহাবীর তো আছেনই। তবে এতসব রথী মহারথীদের ভিড়ে একজন বালক স্থান পাননি মুল মহাভারতে। তবে তার যোগ্যতা অন্য সকল বীরের থেকেও কোন অংশে কম ছিল না। বরং বলতে গেলে অন্য সবার থেকে শ্রেষ্ঠ ছিল তার যুদ্ধবিদ্যা, কারন তিনি চাইলে নিমেষেই শত্রুপক্ষকে নাশ করে দিতে পারতেন তার মাত্র একটি বাণ নিক্ষেপ করে। এই বালকটি ছিলেন ভীমের পৌত্র তথা ঘটৎকচের পুত্র বর্বরিক। কিন্তু এত বড় বীর হওয়ার সত্বেও কেন মহাভারতে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না? কি ঘটেছিল এই অখ্যাত মহাবীরের সাথে? কেনই বা তিনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন নি? জানব বর্বরিকের জীবনের সেই করুন কাহিনী।

বিভিন্ন লোকগাথা ছাড়া পৌরাণিক ভাবে বর্বরিকের উল্লেখ পাওয়া যায় স্কন্ধ পুরাণে। ভীমসেন ও তার রাক্ষসবংশীয় পত্নী হিড়িম্বার পুত্র ছিলেন ঘটৎকচ। ঘটৎকচের বিবাহ হয় মুর নামক এক দৈত্যের কন্যা কামকালীকা বা মতান্তরে মৌরবির সাথে। এই ঘটৎকচ ও কামকালীকার পুত্র বর্বরিক হয়ে ওঠেন অজেয় মহাবীর। দক্ষিণ ভারতে বর্বরিকের পরিচয় হল এক শাপভ্রষ্ট যক্ষ। আবার রাজস্থানে তিনি পূজিত হন খাটুশ্যাম নামে। এই বর্বরিক কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অংশগ্রহন করলে, যুদ্ধের সম্পুর্ণ সমীকরণই উলটে যেত।

একদা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আর অসুর মুরের মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধ সংগঠিত হল। তুমুল যুদ্ধের পর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হাতে নিহত হন মুর। এ খবর শুনে মুরের কন্যা কামকালীকা যুদ্ধ করতে আসলেন। কামকালীকা ছিলেন মা দূর্গার একনিষ্ঠ ভক্ত। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি ভগবান শ্রী কৃষ্ণের ওপর মা দুর্গার দেওয়া যতো অস্ত্র ছিল সবই প্রয়োগ করলেন। কিন্তু জগতের প্রতিপালকের কাছে সমস্ত অস্ত্রই যে ঠুনকো আর মুল্যহীন। তাই কামকালীকার প্রয়োগকৃত সকল অস্ত্র শ্রী কৃষ্ণের কাছে এসে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল। তখন প্রভু শ্রী কৃষ্ণ অসুর কন্যার এমন ধৃষ্টতা দেখে সুদর্শন চক্র দিয়ে কামকালীকাকে বধ করতে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই মা দূর্গা স্বয়ং প্রকট হয়ে শ্রীকৃষ্ণের কাছে কামকালীকাকে না বধ করার জন্য প্রার্থনা করলেন এবং কামকালিকাকে ভগবান শ্রী কৃষ্ণের পরিচয় দিলেন।

এতক্ষণে কামকালীকা তার যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতিপক্ষকে ভালোভাবে চিনতে পারলেন। অনুশোচনায় শ্রী কৃষ্ণের কাছে ক্ষমা চাইলেন তিনি। করুনাসিন্ধু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তখন কামকালীকার যুদ্ধে প্রসন্ন হয়ে তার সঙ্গে ভীমের পূত্র ঘটোৎকচ এর বিবাহ ঠিক করলেন। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তার বিবাহের সম্বন্ধ  করছেন জেনে ঘটোৎকচ অত্যান্ত সম্মানিত বোধ করলেন। কিন্তু তিনি তার মাতা হিড়িম্বার আশির্বাদ নিয়ে এই শুভকার্য সম্পাদন করতে চাইলেন। ঘটৎকচের প্রার্থনা মোতাবেক ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে এবং কামকালীকাকে ভীমপত্নী হিড়িম্বার কাছে নিয়ে গেলেন এবং তাদের শুভ বিবাহ সুসম্পন্ন করলেন। এরপর প্রস্থানের সময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হিড়িম্বাকে নির্দেশ দিলেন, ঘটৎকচ ও কামকালীকার যে সন্তান হবে তাকে ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান প্রদান করতে।

কিছুকাল পরে ঘটৎকচ ও কামকালীকার ঘরে জন্ম নিলেন বর্বরিক নামের এক মহাবীর। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশমত তার পিতামহী হিড়িম্বা তাকে ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান প্রদান করতে থাকলেন। একদা বর্বরিক তার পিতামহীর কাছে মোক্ষ প্রাপ্তির সবচেয়ে সহজ উপায় জানতে চাইলেন। হিড়িম্বা বললেন, যদি তুমি ভগবান শ্রী কৃষ্ণের হাতে বীরগতি প্রাপ্ত হও, তাহলে সাথে সাথে তোমার মোক্ষ লাভ হবে।

এ কথা শুনে বালক বলল, ‘তাহলে আমি ভগবান শ্রী কৃষ্ণের কাছে গিয়ে অনুরোধ জানাব, তিনি যেন তার সুদর্শন চক্র দিয়ে আমার মস্তক ছেদন করে দেন’। এ কথা শুনে হিড়িম্বা হেসে হেসে বললেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কখনই অন্যায়ভাবে কাউকে প্রাণদণ্ড দেন না। তার হাতে বীরগতি প্রাপ্ত হতে হলে তার সমকক্ষ যোদ্ধা হতে হবে, তারপর রণাঙ্গনে দাঁড়াতে হবে তার বিপক্ষে।

বালক বর্বরিকের মনে পিতামহীর কথাগুলো গেঁথে রইল সেদিন থেকেই। তারপর মা দূর্গার কঠোর তপস্যায় ব্রতী হলেন তিনি। মা দূর্গা তার তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে নবরুপে দর্শন দিলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের জ্ঞান দিলেন। কিন্তু এতেও বর্বরিক সন্তুষ্ট হতে পারলেন না, কারন তাকে যে শ্রীকৃষ্ণের সমকক্ষ হতে হবে। তখন মা দূর্গা বললেন, ‘তুমি যে স্থানে বসে তপস্যা করেছ, সেই স্থান সিদ্ধ হয়ে গেছে। তাই তুমি এই স্থানে বসে সিদ্ধিমাতার উপাসনা করো। সিদ্ধিমাতা তোমাকে তোমার অভীষ্ট বর প্রদান করবেন।’

শুরু হল সিদ্ধিমাতার তপস্যা। বর্বরিকের কঠোর তপস্যায় অত্যান্ত সন্তুষ্ট হলেন সিদ্ধিমাতাও। বর হিসেবে দিলেন তিনটি তিনটি বাণ। অদ্ভুত অমোঘ এই তিন বাণ। প্রথম বাণ যুদ্ধক্ষেত্রের সমস্ত শত্রুকে চিহ্নিত করে। দ্বিতীয় বাণ চিহ্নিত করে তাদের যাদের ক্ষতি হবে না।আর তৃতীয় বাণ সমস্ত চিহ্নিত শত্রুর বিনাশ করে। এই সব অস্ত্রের কারনে বর্বরিক হয়ে উঠলেন অজেয়। তবে এই সব কিছুর পিছনে বর্বরিক এর উদ্দেশ্য ছিল শ্রীকৃষ্ণের হাতে মৃত্যু লাভ করা। কারন তিনি জানতেন তার কাছে যে অস্ত্র আছে তাতে কৃষ্ণ ব্যতিত ত্রিভুবনের কেও তাকে মারতে সক্ষম হবে না।

এদিকে, সিদ্ধিমাতার আশির্বাদে বর্বরিক যখন অজেয়, ঠিক তখনই হস্তিনাপুরে বেজে উঠেছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের দামামা। একপক্ষে লড়বেন পাণ্ডবগন অন্য পক্ষে কৌরবগন। রক্তের টানে বর্বরিক বেরিয়ে পড়লেন কুরুক্ষেত্রের রণক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে। যথারীতি পাণ্ডব শিবিরে আনন্দের বাতাস, কারন বর্বরিকের মত অজেয় বীর তাদের হয়ে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে রওনা করেছেন। কিন্তু বর্বরিক শুধু অমোঘ অস্ত্রই আনেননি। সঙ্গে এনেছিলেন গুরুকে দেয়া একটি প্রতিজ্ঞা। তার প্রতিজ্ঞা ছিল, যুদ্ধে যে পক্ষ দুর্বল, বর্বরিককে সবসময় লড়তে হবে সেই পক্ষের হয়ে। এতেও কারোর চিন্তার কারণ ছিল না। কারণ গাণিতিক ভাবে পাণ্ডবপক্ষ দুর্বল। কিন্তু সবাই খুশি হলেও শ্রীকৃষ্ণ খুশি হতে পারছিলেন না। কারন তিনি বর্বরিকের ওই প্রতিজ্ঞার আসল স্বরূপ ধরতে পেরেছিলেন। তিনি জানতেন দুর্বল আর সবল পক্ষ একটি আপেক্ষিক ব্যাপার।

 

তাই শ্রীকৃষ্ণ এক ব্রাহ্মনের ছদ্মবেশে সাক্ষাৎ করলেন সেই বিষ্ময় বালক বর্বরিকের সাথে,। প্রশ্ন করলেন ‘হে বালক, তুমি যুদ্ধ করতে এসেছ কিন্তু মাত্র তিনটি বাণ নিয়ে এসেছ, তোমার সৈন্য কোথায়?

বালকটি বলল, ‘আমার কোনো সৈন্যের প্রয়োজন নেই। আমার এই তিন বানের এক বানেই আমি সম্পুর্ন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ করতে পারি।

উত্তর শুনে স্তম্ভিত শ্রীকৃষ্ণ। কী করে তা সম্ভব, জানতে চান তিনি। তার সেই বিশেষ ধনুর্বাণ দেখিয়ে বর্বরিক বোঝালেন সেগুলোর ক্ষমতার কথা। প্রথম তীরটি নিক্ষেপ করলে তা গিয়ে যাদের নিধন করতে চাই তাদের চিহ্নিত করে ফিরে আসবে। দ্বিতীয়টি এর ঠিক উল্টো – যাদের মারতে চাই না তাদের চিহ্নিত করবে সেটা। আর তৃতীয়টাই আসল কাজ করবে – প্রথম বাণটির দ্বারা চিহ্নিত সবাইকে, অথবা দ্বিতীয় বাণটির দ্বারা চিহ্নিতদের বাদ দিয়ে বাকি সবাইকে মেরে আবার তূণীরে ফিরে আসবে। সুতরাং শুধুমাত্র তিনবার তীরনিক্ষেপ করলেই শত্রুপক্ষ নিঃশেষ হবে এক নিমেষে!

এবার ব্রাহ্মনবেশী শ্রীকৃষ্ণ পরীক্ষা দিতে বলেন বর্বরিককে “যে অশ্বথ গাছের তলায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি তার সবগুলো পাতাকে একটিমাত্র তীরে গেঁথে দেখাও।” রাজি হয় বালক। বালকটির অলক্ষ্যে এই ফাঁকে গাছ থেকে একটি পাতা ছিঁড়ে নিজের পায়ের তলায় লুকিয়ে ফেলেন শ্রীকৃষ্ণ। প্রথম তীরটি ছোঁড়ার পর সেটি চোখের নিমেষে গাছের সবকটি পাতাকে চিহ্নিত করে শ্রীকৃষ্ণের পায়ের ঠিক ওপরে দাঁড়িয়ে পরে, যেখানে লুকোনো পাতাটি আছে। বর্বরিক ব্রাহ্মণকে অনুরোধ করে তার পা সরিয়ে ফেলতে, অন্যথায় পরবর্তী বাণ পা ভেদ করে নিচের পাতা ছেদন করবে। এরপর যথারীতি তৃতীয় বাণটি নিক্ষেপ করলেন বর্বরিক এবং সমস্ত পাতা ছেদন করে ফিরে ফেল তার তূণীরে।

শ্রীকৃষ্ণ বুঝলেন বর্বরিকের সম্পর্কে শোনা একটি বর্ণও মিথ্যা নয়। তার এই একটি অস্ত্রেই কৌরব বা পান্ডব পক্ষের তাবড় তাবড় রথী মহারথীকে বধ করতে পারে চক্ষের নিমেষে! আর, সবচেয়ে যা ভয়ানক তা হলো যে লুকিয়েও কোনো নিষ্কৃতি নেই – তীরগুলি  নিয়তির মতো অমোঘ নিয়মে উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে খুঁজে বার করে হত্যা করবে, তা সে যেখানেই আত্মগোপন করুক না কেন! অনায়াসে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর হতে পারে এই বর্বরিক!

স্বয়ং ভীমসেন যার পিতামহ সে নিঃসন্দেহে পাণ্ডব্দের পক্ষে যোগ দেবে এ কথা তো সবাই জানে, তবু নিশ্চিত হওয়ার জন্য বালকের কাছে জানতে চান ব্রাহ্মনবেশী শ্রীকৃষ্ণ – “হে বালক, যুদ্ধে কোন পক্ষে লড়াই করবে তুমি?”।

উত্তরে বর্বরিক বললেন “ আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, যে পক্ষ দুর্বল তাদের হয়েই আমি যুদ্ধ করব” উত্তর শুনে শ্রীকৃষ্ণ নিশ্চিত হলেন এই বালক পাণ্ডবদের হয়েই রণক্ষেত্রে নামবে। কারন কৌরবদের সৈন্য সংখ্যা এগারো অক্ষৌহিণী এবং তার বিপরীতে পান্ডবদের মাত্র সাত অক্ষৌহিণী।

এবার শ্রীকৃষ্ণ আসল কথাটা বর্বরিকের সামনে আনলেন। তিনি তাকে বোঝালেন যে যুদ্ধে দুর্বল পক্ষ একটি আপেক্ষিক সত্য। ধরা যাক আজ সে পান্ডবদের হয়ে লড়াই শুরু করলো, কৌরবরা তো অচিরেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এরপর কৌরবরাই হবে দুর্বল পক্ষ, সুতরাং প্রতিজ্ঞামতো সে তখন দল পাল্টে তাঁদের হয়ে যুদ্ধ করবে। এবার নির্মূল হওয়ার পালা পান্ডবদের। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত বর্বরিক নিজে ছাড়া আর কেউই বেঁচে থাকবে না। এরকম যুদ্ধ হয়ে লাভটা কী ?  বর্বরিক ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। কিন্তু ক্ষত্রিয়ের প্রতিজ্ঞা বলে কথা– উপায় তো কিছু নেই ! তবে এর কোন সমাধান থাকলে তা ব্রাহ্মনবেশী শ্রীকৃষ্ণের কাছে জানতে চাইলেন বালক বর্বরিক।  তাতে শ্রীকৃষ্ণ বললেন এর সমাধান হল যুদ্ধে অংশগ্রহন না করা। অনেক ভেবেও শ্রীকৃষ্ণের প্রস্তাবে সম্মত হতে পারল না বর্বরিক। কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এতে মনে করবে বর্বরিক কাপুরুষ ছিল। তাই যুদ্ধে যোগ না দেয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

সমস্ত প্রয়াস ব্যার্থ হওয়ার পরে শ্রীকৃষ্ণ এবার তার মোক্ষম চালটি চাললেন। বর্বরিকের কথা শেষ না হতেই ব্রাহ্মনবেশী শ্রীকৃষ্ণ বলে উঠলেন, ‘ভবতি ভিক্ষাং দেহি’। অর্থাৎ, যেহেতু তিনি দরিদ্র ব্রাহ্মন ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে তার সাথে কথা বলছিলেন তাই তিনি এবার ভিক্ষা চাইলেন। বালকটি বললেন, বলুন ব্রাহ্মনদেব,– কী ভিক্ষা চাই আপনার? উত্তরে শ্রীকৃষ্ণ বললেন ‘তোমার মস্তক’। বিস্মিত হলেন বর্বরিক, বুঝলেন এই ব্রাহ্মণ সাধারণ কেউ নন। তিনি বললেন, অবশ্যই আপনি আমার মস্তক ভিক্ষা হিসেবে পাবেন, কিন্তু তার আগে আপনার আসল পরিচয় বলুন।

শ্রীকৃষ্ণ এবার স্বরূপে আবির্ভূত হলেন বর্বরিকের সামনে। স্বয়ং জগৎপতিকে চোখের সামনে দেখে আনন্দের আতিশয্যে চোখ দিয়ে আনন্দাশ্রু নির্গত হতে থাকল বর্বরিকের। তার সারা জীবনের সাধনা যার হাতে বীরগতি প্রাপ্ত হওয়ার, আজ তিনি নিজে তার মস্তক ভিক্ষা চেয়েছেন। এর থেকে বড় প্রাপ্তি তার জীবনে আর কিই বা হতে পারে। বর্বরিক বললেন “ প্রভু, আপনার আদেশ শিরোধার্য। কিন্তু আমি যে নিজের চোখে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ দেখব বলে অনেক আশা নিয়ে এসেছি। আপনি তো করুনাসিন্ধ, আপনি কি আমার মৃত্যুর পরেও আমাকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ দেখার সুযোগ করে দিতে পারেন না?”

ক্ষুদ্র বালকের তার প্রতি এত গভীর ভক্তি দেখে করুনার উদ্রেক হল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মনে। তিনি তাকে আশির্বাদ করে বললেন, “ হে বালক, তোমার শরীর থেকে মস্তক আলাদা হয়ে গেলেও, তোমার মস্তক জীবিত থাকবে এবং তা স্বাভাবিকভাবে দেখতে ও শুনতে পাবে। এছাড়াও তোমার ছিন্ন মস্তক স্থাপন করা হবে কুরুক্ষেত্রের সবচেয়ে উচু স্থানে, যেখান থেকে তুমি কুরুক্ষেত্রে সংগঠিত সমস্ত ক্রিয়াকলাপ আমার দেওয়া দিব্য চক্ষু দিয়ে অবলোকন করতে পারবে এবং কর্ণ দ্বারা শ্রবণ করতে পারবে।”

এবার বর্বরিক খুশিমনে তার মস্তক ছিন্ন করে শ্রীকৃষ্ণের হাতে দিলেন। শ্রীকৃষ্ণও তার কথামত সেই মস্তক স্থাপন করলেন কুরুক্ষেত্রের সুউচ্চ স্থানে।

এরপর পরবর্তী ১৮ দিন ধরে চলল কুরুক্ষেত্রের মহারণ। বিজয় আসল পাণ্ডব শিবিরে এবং পরাজিত হল কৌরবগন। যুদ্ধাবসানের পর কে বেশি বীরত্ব দেখিয়েছে? অর্জুন নাকি ভীম যখন এই নিয়ে সবাই যখন তর্কে ব্যস্ত, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাদের নিয়ে যান বর্বরিকের মাথার কাছে। তারা বর্বরিককে বললেন, “যেহেতু তুমি সম্পুর্ন যুদ্ধ দেখেছ, তুমিই বল, কে এই যুদ্ধের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর? ”

প্রশ্ন শুনে ঈষৎ হাসলেন বর্বরিক, বললেন, ‘আমি শুধু শ্রীকৃষ্ণকেই দেখেছি। নিহত ও নিধনকারী – সবাই আসলে কৃষ্ণ। সুতরাং তিনিই এই যুদ্ধের শ্রেষ্ঠতম বীর! আমি দেখেছি অর্জুনের তীর বা ভীমসেনের গদা শত্রুর প্রাণ নেয়ার আগেই কৃষ্ণের চক্র শত্রুর সংহার করে ফেলেছে। আমি দেখেছি পুরো রণক্ষেত্রে মাতা দ্রৌপদী মাতা মহাকালীর রূপ ধারন করে শত্রুর রক্তপান করছেন। তোমরা যে তোমাদের পরাক্রম নিয়ে এত প্রশংসা করছ, কিন্তু আমিতো একজনকেও কোনো পরাক্রম দেখাতে দেখলাম না। সুদর্শন চক্র ভীষ্মর দেহ ছিদ্র করছিল, আর অর্জুনের নিরর্থক বান গুলো সেই ছিদ্রের ভিতর দিয়ে ঢুকছিল’ এইভাবে সমগ্র গীতার সারাৎসার অতি সংক্ষেপে বুঝিয়ে দেয় বর্বরিক।

এসময় শ্রীকৃষ্ণ তাকে বাধা দিয়ে বললেন, তুমি তোমার দিব্য দৃষ্টিতে যা দেখেছ, এরা চর্ম চক্ষুতে তা দেখতে পারেনি। সে কারনেই এরা নিজেদের বীরত্বের প্রতি এতটা গর্বিত। কিন্তু তারা জানেনা সমস্ত কারনের আদি কারন একমাত্র আমি।

 

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষ, আর কলিযুগের শুরু। বর্বরিকের মৃতদেহ আগেই ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল নদীতে, এখন তার মাথা পুঁতে দেওয়া হয় মাটিতে। শ্রীকৃষ্ণ বর্বরিকের এই আত্মত্যাগে সন্তুষ্ট হয়ে বর দেন ‘কলিযুগে আমার জায়গা নিয়ে তুমি দুষ্টের দমন করবে। আমার নামেই লোকে চিনবে তোমায়।’ সেই বরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে  খাটুশ্যামজী নামেই পূজিত হন বর্বরিক। রাজস্থানের খাটু নামক একটি ছোট্ট গ্রামের খাটুশ্যামজী মন্দিরে একটি ছিন্ন মস্তক পূজিত হয় খাটুশ্যামজী নামে। আবার শ্যামবাবা নামেও তিনি পরিচিত অনেকের কাছে। কথিত আছে যে এইখানেই বর্বরিকের প্রোথিত ছিন্ন মস্তক খুঁজে পাওয়া যায় আনুমানিক এক হাজার খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ, এবং তৎকালীন রাজা রূপ সিং চৌহান স্বপ্নাদেশ পেয়ে সেই জায়গায় মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

তবে অন্যমতে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে মানস সরোবরে রক্ষিত বর্বরিকের বাকি দেহ আনা হল। অশ্বিনী কুমার ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে সেই মস্তক আর দেহ আবার জুড়ে দিলেন। নিজের সম্পুর্ন দেহ ফিরে পেয়ে বর্বরিক জানালেন, এই যুদ্ধ দেখে তার সংসারে আসক্তি নাশ হয়েছে। তাই তিনি বাকি জীবন হিমালয়ে তপস্যা করে কাটাতে চান। তারপর সবার আশীর্বাদ নিয়ে বর্বরিক বেরিয়ে পড়লেন হিমালয়ের উদ্দেশ্যে।

তবে তার মৃত্যু যেভাবেই হোক না কেন, শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় তার যে মোক্ষলাভ হয়েছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এ প্রসঙ্গে একটি কথা না বললেই নয়, আপনারা অনেকেই হয়ত জানেন না অর্জুন ছাড়া প্রত্যক্ষভাবে কৃষ্ণের মুখ থেকে গীতা শুনেছিলেন আরও তিনজন। প্রথমজন ছিলেন সঞ্জয়। তিনি যুদ্ধের সমস্ত ঘটনা অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের কাছে বর্ণনা করার জন্য বেদব্যাসের কাছ থেকে দিব্য দৃষ্টি লাভ করেছিলেন। দ্বিতীয়জন হলেন হনুমান যিনি অর্জুনের রথের চূড়ায় বসে ছিলেন ও তৃতীয় ব্যাক্তি ছিলেন ঘটোৎকচের পুত্র বর্বরিক যার কাহিনী আপনারা এতক্ষন শ্রবন করলেন।

এবার আসি তথ্যসূত্রের প্রসঙ্গে। আপনারা জানেন বর্বরিক চরত্রটি একলব্যের মতই মহাভারতে উপেক্ষিত। তাই তার সম্পর্কে জানতে হলে বিভিন্ন লোককথা ও পুরাণের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া অন্য বিকল্প থাকে না। এই ভিডিওটিও তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন উপকথা ও স্কন্ধ পুরাণে বর্ণিত কাহিনীকে আশ্রয় করে। যেহেতু এই ঘটনাগুলো কালাদিক্রমে মানুষের মুখে মুখে ভ্রমন করেছে সেহেতু এই কাহিনীতে বিচ্যুতি বা বিকৃতি থাকা অসম্ভব নয়।

4.5/5 - (2 votes)

Leave a Reply