You are currently viewing অগস্ত্য মুনি কেন অগস্ত্য যাত্রা করেছিলেন? || আধুনিক ব্যাটারির জনক অগস্ত্য! || Agastya Muni Story

অগস্ত্য মুনি কেন অগস্ত্য যাত্রা করেছিলেন? || আধুনিক ব্যাটারির জনক অগস্ত্য! || Agastya Muni Story

অগস্ত্য যাত্রা” প্রবাদটির নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই। শেষ যাত্রা বা চিরবিদায় বোঝাতে ব্যাপকভাবে ব্যাবহৃত হয় অগস্ত্য যাত্রা শব্দযুগল। মুলত অগস্ত্য মুনির শেষ যাত্রাকে নির্দেশ করেই এই বাগধারাটির উদ্ভব। তবে অগস্ত্য মুনি সম্পর্কে চমকে যাওয়ার মত তথ্যটি হচ্ছে তিনিই সর্বপ্রথম আধুনিক ব্যাটারির ধারনা দেন।  কি অবাক হলেন? অগস্ত্য মুনির সমস্ত জীবনই ছিল এমনই সব চমকপ্রদ ঘটনাসমৃদ্ধ। এই অগস্ত্য মুনিকে নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন। আমরা জানব কে ছিলেন এই অগস্ত্য মুনি? কিভাবে জন্ম হয়েছিল তাঁর, কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অগস্ত্য যাত্রা করেছিলেন তিনি? কিভাবে অগস্ত্য সংহিতার একটি শ্লোক থেকে আধুনিক ব্যাটারির ধারনা পাওয়া গেল? কেন অগস্ত্য মুনি সমুদ্রের সব জল পান করেছিলেন? অগস্ত্য মুনির জীবনীভিত্তিক এই আলোচনাটি শেষ অব্দি পড়ার আমন্ত্রন রইল সবাইকে।

অগস্ত্য মুনির জন্মঃ

ঋকবেদ বলছে, অপ্সরা উর্বশীর মাধ্যমে মিত্রবরুন তথা সুর্যদেব ও বরুনদেবের ঔরসে যজ্ঞের কুম্ভ থেকে জন্ম নেন দুজন মহাজ্ঞানী ঋষি। তাদের একজন ছিলেন ঋষি বশিষ্ঠ এবং আরেকজন ঋষি অগস্ত্য।  অগস্ত্য মুনি প্ৰতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তিনি চিরকাল কৃতদার থাকবেন তথা কখনোই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবেন না। এই ঋষি একদিন অরণ্যভুমিতে পরিভ্রমণ করার সময় একটি রহস্যময় গুহা দেখতে পেলেন। সাধারন দৃষ্টিতে গুহাটি পরিত্যাক্ত মনে হলেও মুনি তাঁর তপোবলের মাধ্যমে জানতে পারলেন সেখানে আসলে তাঁর পূর্বপুরুষেরা অধোমুখে লম্বমান হয়ে অতি কষ্টে ঝুলন্ত অবস্থায় আছেন। মুনি তখন তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন কেন তাঁরা এমন উদ্ভট ভঙ্গিতে গুহাবাস করছেন? উত্তরে পূর্বপুরুষগণ জানালেন বংশরক্ষা না করলে তাঁদের সদগতির কোন আশা নেই। তাদের আত্মার সদগতির অভাবেই তাঁরা এমন শোচনীয় জীবন যাপন করছেন। অগত্যা অগস্ত্য মুনি তাঁর অঙ্গীকার ভঙ্গ করে পুর্বপুরুষদের আশ্বাস দিলেন যে, পিতৃপুরুষগণের জন্য তিনি বংশরক্ষার ব্যবস্থা করবেন।

অগস্ত্য মুনির বিবাহঃ

অগস্ত্য মুনি নিজে খর্বকায় ছিলেন বটে কিন্তু তাঁর ইচ্ছা ছিল যদি বিবাহ করতেই হয় তাহলে তিনি এমন নারী বিবাহ করবেন যার সৌন্দর্য হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ। কিন্তু বাস্তবে এমন নারী মেলানো কষ্টকর, অনেক চেষ্টা করেও তিনি এমন সুন্দরী নারীর দেখা পেলেন না। অবশেষে তিনি তাঁর তপোবলে পৃথিবীর সমন্ত প্রাণীর সুন্দর ও শ্রেষ্ঠ অংশ গ্ৰহণ করে এক পরমাসুন্দরী নারী সৃষ্টি করলেন। এই কন্যার নাম হলো লোপামুদ্রা। কারণ, সমস্ত জীবের সৌন্দর্যের শ্রেষ্ঠ অংশ লোপ করে এই নারী জন্ম নিয়েছেন। এই নারীর লালন পালনের ভার  দিলেন বিদর্ভরাজের হাতে । যাইহোক কালের পরিক্রমায় একদিন বড় হয়ে উঠলেন লোপামুদ্রা। এরপর তিনি বিবাহযোগ্যা হলে অগস্ত্য মুনি বিদর্ভরাজের রাজদরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁকে স্ত্রীরূপে প্ৰাৰ্থনা করলেন। এমন পরামসুন্দরী নারীকে খর্বকায় দরিদ্র ঋষির হাতে তুলে দিতে  বিদৰ্ভরাজ সম্মত হতে পারছিলেন না। কিন্তু লোপামুদ্রা নিজেই এই দরিদ্র ঋষির অর্ধাঙ্গিনী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে বিদর্ভরাজ অনিচ্ছাসত্ত্বেও লোপমুদ্রাকে তাঁর হাতে দান করলেন।

একদিন লোপামুদ্রা তাঁর স্বামীকে বললেন, ‘ঋষিবর! আমি আপনার সংযমী স্বভাব জানি। কিন্তু আপনার পূর্বপুরুষদের কথাও ভাবা উচিত। তাঁরা মুক্তির আশায় এখনও গর্তে ঝুলে রয়েছেন। নিজের সুখের জন্য না হলেও পূর্বপুরুষদের জন্য সন্তান উৎপাদনের ধর্মপালন করুন। এরপর লোপামুদ্রা একদিন ঋতুস্নান করে অগস্ত্যের কাছে এলে মুনি তাঁকে পুত্রোৎপাদনের জন্য আহবান করলেন। কিন্তু লোপামুদ্রা বললেন, হে ঋষিবর, আমাকে ক্ষমা করবেন, এমন দীন-জীর্ণ অবস্থায় আমি আপনার সন্তান উৎপাদন করতে পারব না। আমি আমার পিতৃগৃহে যেরূপ অলঙ্কারভূষিতা হয়ে এবং যেরুপ রাজশয্যায় শয়ন করতাম, সেইরূপ অলংকার ও শয্যাসামগ্রী না পেলে আমি পুত্রোৎপাদনে অংশগ্রহণ করতে পারব না। দরিদ্র মুনির কোনভাবেই এরকম রাজকীয় আভুষন এবং অলংকার ক্রয় করার সামর্থ্য ছিল না। লোপামুদ্রার ইচ্ছা শুনে অগস্ত্য বললেন, ‘প্রিয়ে! তোমার পিতা রাজা, আর আমি তপস্বী। তোমার ইচ্ছাপূরণের সামর্থ্য আমার নেই।’ কিন্তু লোপামুদ্রা কোন কথা শুনতে নারাজ। তিনি প্রয়োজনে রাজার দরবারে ভিক্ষা করে হলেও তাঁর এই বাসনা মেটাতে তাগিদ দেন মুনিকে।

লোপামুদ্রার কথায় অগস্ত্য খুবই কষ্ট পেলেন। তবে হাল ছাড়লেন না তিনি। স্ত্রীর বাসনা পুরন করার জন্য বিভিন্ন রাজার দরবারে হাজির হলেন ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে। কিন্তু তিনি যে রাজার দরবারেই যান সেখানে আয় ব্যায়ের হিসেব করে কোন উদ্বৃত্ত সম্পদ খুঁজে পেলেন না তিনি।  অবশেষে অগস্ত্য মুনির এমন অবস্থা দেখে রাজা ত্রসদস্যু তাঁকে একটা বুদ্ধি দিলেন।  তিনি তাঁকে এক ধনশালী রাক্ষস ইল্বলের সন্ধান দিলেন।

অগস্ত্য মুনির রাক্ষস ইল্বল ও বাতাপি বধঃ

পুরাণমতে এই ইল্বল রাক্ষসের যে কাহিনী জানা যায় তা হলঃ  পিপ্পলি বনে ইল্বল ও বাতাপি নামক দুই রাক্ষস বাস করতেন। সেই মায়াদয়াহীন ভয়ানক রাক্ষস যুগল নিষ্ঠুর ভাবে ব্রাহ্মণ বধ করতেন । সেও ছিলো এক অদ্ভুত রকমের মায়া। যেনো মিছরির ছুরি, কোন আক্রমণ, অস্ত্রাদি ছাড়াই তাঁরা শত শত ব্রাহ্মণকে হত্যা করেছিলেন । তাদের কৌশল ছিল মায়াবিদ্যায় পারদর্শী বাতাপি মেষের রূপ ধারন করে থাকতেন আর ইল্বল ব্রাহ্মণদেরকে আমন্ত্রণ করে আনতেন । এরপর মেষরূপী বাতাপিকে কেটে রান্না করে সেই ব্রাহ্মণকে মাংস ভোজন করাতেন। ব্রাহ্মণও অমৃত ভেবে সেই মৃত্যুবিষ গ্রহণ করতেন। পরে ইল্বল মায়াবিদ্যা দ্বারা বাতাপিকে ডাকলে , বাতাপি সেই ব্রাহ্মণের পেট ফুঁড়ে রাক্ষস দেহে বেরিয়ে আসতেন । এদিকে উদর ছিন্ন হয়ে সেই ব্রাহ্মণ ভয়ানক যন্ত্রনা পেয়ে মৃত্যুমুখে ধাবিত হতেন । এভাবে ইল্বল ও বাতাপি তাদের রাক্ষস রাজত্ব চালাতেন । যে ব্রাহ্মণ ইল্বলের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করতেন তিনি সাক্ষাৎ মৃত্যুদূতের আমন্ত্রণ গ্রহণ করতেন। রাজা ত্রসদস্যু অসগস্ত্য মুনিকে বোঝালেন যে এই রাক্ষসযুগলের কাছে যে বিপুল ধনরাশি সঞ্চিত আছে তা দিয়ে অনায়াসেই লোপামুদ্রার সমস্ত আবদার মেটানো সম্ভব। রাজি হলেন অগস্ত্য। একদিকে নিষ্ঠুর, রক্তলোলুপ রাক্ষসের নিধন অন্যদিকে প্রিয়তমা স্ত্রীর মানভঞ্জন। এমন সুযোগ বারে বারে আসে না। তাই অগস্ত্য মুনি ধাবিত হলেন ইল্বল ও বাতাপির রাজ্যে।

এদিকে অগস্ত্য মুনিকে রাজ প্রাসাদের দিকে আসতে দেখে রাক্ষসদের আনন্দ আর ধরে না। ইল্বল অগস্ত্য মুনিকে সাদরে বন্দনা জানিয়ে বলল- “হে মহামুনে! আপনার আগমনে আমি ধন্য। কৃপা করে মম গৃহে আপনার শ্রীচরণের ধুলো দিলে আমি কৃতার্থ হবো। হে ব্রাহ্মণ! আপনি কৃপা বশত আজ আমার গৃহে অবস্থান করে, আহার গ্রহণ করে আমাকে ধন্য করবেন।” অগস্ত্য মুনিও রাক্ষসের ফাদে পা দেবার অভিনয় করে চললেন ইল্বলের সাথে। অগস্ত্য মুনি বললেন- “হে বৎস! আজ আমাকে মেষমাংস আহার করাও ! বহুদিন যাবৎ মেষমাংস আহারের ইচ্ছা ।” ইল্বল খুশীতে ডগমগ, এটাই তো চায় সে ।এরপর মেষরূপী বাতাপি কে কেটে রন্ধন করলেন ইল্বল। অপরদিকে স্নানান্তে অগস্ত্য মুনি কমণ্ডলু তে গঙ্গা দেবীর আহ্বান করে মটির পাত্র নিয়ে আহারে বসলেন । বললেন- “বৎস! আমাকে সব টুকু মেষ মাংসই প্রদান করো। লোভ বশে নিজের জন্য সামান্য কিছু রাখলে আমি শাপ দেবো।” ইল্বল মাটির পত্রে অন্নাদি ব্যাঞ্জন ও সবটুকু মেষ মাংস প্রদান করলেন । অগস্ত্য মুনি পরম তৃপ্তি সহকারে একেবারে সবটুকু মেষমাংস ভোজন করলেন। মুনির আহার শেষ হলে ইল্বল খুশিতে ডগমগ হয়ে “বাতাপি” , “বাতাপি” বলে ডাকতে লাগলো। কিন্তু কোথায় বাতাপি? মুনির পেট ফুড়ে বের হওয়া তো দূরের কথা, মুনি তখন তৃপ্তির ঢেকুর তুলে চলেছেন ইল্বলের সামনে। অনেক ডাকাডাকি করে ইল্বল যখন হয়রান হলেন তখন অগস্ত্য মুনি বললেন- “তোমার সকল ছলছাতুরী আমি জানতাম। তোমাদের বিনাশের জন্যই আমি এখানে এসেছি। বাতাপি আর আসবে না। তাকে আমি হজম করে ফেলেছি, সে আর বেঁচে নেই।” মুনির কথা শুনে ক্রুদ্ধ হলেন ইল্বল, তিনি তৎক্ষণাৎ অগস্ত্য মুনিকে বধ করতে উদ্যত হলেন। মুনিও আর দেরী না করে তাঁর তপোবল দিয়ে ভস্মীভূত করে দিলেন রাক্ষস ইল্বলকে।

ইল্বল ও বাতাপিকে বধ করে ঋষি অগস্ত্য বিপুল পরিমান ধনসম্পদের মালিক হয়েছিলেন। এই ধনরত্ন দিয়ে লোপামুদ্রার মনস্কামনা পূর্ণ হওয়ায়, তিনি অগস্ত্যের কাছ হতে বীৰ্যবান পুত্র প্রার্থনা করলেন। এঁর ফলে তাদের দৃড়স্যু নামে এক শক্তিশালী পুত্রলাভ হয় এবং এই পুত্ৰই তাদের পূর্বপুরুষদেরকে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে মুক্ত করেন।

অগস্ত্য মুনির সমুদ্রের জলপানঃ

অগস্ত্য মুনির ঘটনাবহুল জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে সমুদ্রের জলপান। একবার বৃত্তাসুর নামক এক অসুর স্বর্গ মর্ত্ত্য ও পাতালে চরম দুর্বৃত্তায়ন শুরু করেছিলেন। এই বৃত্তাসুরের সহযোগীরা ছিল কালকেয় জাতির অসুরগণ। কালকেয় অসুরগণ বৃত্তাসুরকে পেছন থেকে শক্তি যোগাচ্ছিল। এক পর্যায়ে মহামুনি দধিচীর অস্থি বা হাড় দিয়ে বজ্র নির্মান করে দেবরাজ ইন্দ্র বৃত্তাসুরকে বধ করেন। এর ফলে কালকেয় অসুরগন দুর্বল হয়ে পড়েন। তাঁরা সমুদ্রের গভীর তলদেশে লুকিয়ে পড়লেন দেবতাদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য। কিন্তু এতে তাদের দৌরাত্ন কমল না। বরং কিন্তু প্রতি রাতে সমুদ্র থেকে উঠে এসে মানুষ, প্রানিকুল এবং মুনি ঋষিদের উপর নারকীয় তান্ডব চালাতে লাগলেন তাঁরা। দেবতারা পড়লেন উভয় সংকটে, কারন সমুদ্রের অসুরদের বিনাশ করতে হলে সমুদ্রে বসবাসরত অন্যান্য নিরীহ প্রানীর বিনাশ ঘটবে। অবশেষে তাঁরা দারস্থ হলেন অগস্ত্য মুনির। অগস্ত্য মুনি তখন তাঁর তপোবলে সমুদ্রের সব জল পান করে লুকায়িত অসুরদের বাইরে বের করে আনেন। এরপর দেবতারা কালকেয় অসুরদের বিনাশ করেন। কিন্তু অগস্ত্য মুনি সমুদ্রের সেই জল আর ফেরত দেন নি। কারন পান করা জলের সবটুকুই তিনি হজম করে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে রাজা ভগীরথ স্বর্গ থেকে দেবী গঙ্গাকে মর্ত্ত্যে আনয়ন করে পুনরায় সমুদ্রের জল পূর্ণ করেছিলেন।

এবার আসুন অগস্ত্য যাত্রার পৌরাণিক কাহিনীটি জেনে নেওয়া যাক।

পুরাণ বলছে এই কাহিনীর সূত্রপাত ঘটেছিল দেবর্ষি নারদের হাত ধরে। দেবতা হয়েও তিনি ছিলেন ঋষি, তাই তিনি দেবর্ষি নামেও পরিচিত। প্রজাপতি ব্রহ্মার মনন থেকে উৎপন্ন হয়েছিলেন নারদ মুনি তাই তাঁকে ব্রহ্মার মানসপুত্রও বলা হয়। পালনকর্তা বিষ্ণুর আরাধনা করেই তিনি দেবত্ব ও ঋষিত্বকে একীভূত করেছেন নিজের মাঝে। তাই তাঁর সৃষ্টির পর থেকেই তিনি নিরন্তর “নারায়ন, নারায়ন” ধ্বনি উচ্চারন করে চলেছেন। এছাড়াও তিনি ভগবান বিষ্ণুর প্রসাদ ছাড়া অন্য কোন কিছু গ্রহন করেন না। কিন্তু এখনেই তাঁর গুনের শেষ নয়। তার চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার ‘কলহ সংগঠক’ চরিত্রটি। আশা করি নারদের ভুমিকা সম্পর্কে আপনারা ইতিমধ্যেই অবগত। মানুষ কিংবা অসুর সমাজে যখনি কোন প্যাঁচ কষার প্রয়োজন হত, নারদ মুনি সেখানেই তার বাহন ঢেঁকিযোগে হাজির হতেন। তাঁর কথা ভেতরে ও বাহিরে এমনি দ্বৈত-অর্থ বহন করত যে, তিনি যখনই কারো পক্ষে কথা বলেছেন, তখন সে পক্ষও নিশ্চিত নয় আখেরে নারদ কোন পক্ষের। যাই হোক, নারদ মুনি যে শুধু দেবতাদের পক্ষ নিয়ে মানুষ বা অসুর সমাজেই প্যাঁচ খেলেছেন এমনটা নয়। যখন নিচে অর্থাৎ মর্ত্যধামে কোন কাজ থাকত না, সময়ে সময়ে তিনি ঢেঁকিযোগে স্বর্গধামে গিয়ে দেবসমাজেও স্বীয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। এই নারদমুনি একবার স্বভাবমত বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিভ্রমন করে বেড়াচ্ছিলেন। এসময় তিনি বিন্ধ্য পর্বতাঞ্চলের পাশে এসে হাজির হলেন।  বর্তমানে এই বিন্ধ্য পর্বতশ্রেণীর অবস্থান ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে এবং এই সমগ্র পর্বতশ্রেণি বিন্ধ্যাচল নামেও পরিচিত। তো বিন্ধ্য পর্বতের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বিন্ধ্য পর্বতের বিশালতা এবং সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলেন নারদ মুনি। তিনি চাইলেন বিন্ধ্য পর্বতের সাথে কিছুক্ষন কথা বার্তা বলা যাক। কিন্তু শুধু কথা বললেই কি করে চলবে? তিনি তো দেবর্ষি নারদ। তাঁর কথায় যদি ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়া বা মিথষ্ক্রিয়া না ঘটে তাহলে তাঁর স্বার্থকথা কোথায়?  তাই নারদ মুনি তখন বিন্ধ্যকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,“হে, বিন্ধ্য পর্বত। তোমার এই অপরূপ সৌন্দর্য যেকোনো পর্বতের সৌন্দর্যের থেকে অতুলনীয়। সৌন্দর্যের দিক থেকে তুমি সকল পর্বতের থেকে অগ্রগামী হতে পারতে। কত জীব তোমাকে আশ্রয় করে বেঁচে আছে। কত মুনি ঋষি তোমার আশ্রয়ে গুহায় বসে নির্বিঘ্নে তপস্যা করছেন। তোমার এই উদারতা আমাকে যারপরনাই মুগ্ধ করেছে।”এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই বলছিলেন দেবর্ষি নারদ, কিন্তু এরপর তিনি মলিন মুখে একটি দীর্ঘঃশ্বাস ছাড়লেন। নারদ মুনির গুণগান শুনে বিন্ধ্য পর্বত খুবই গর্ববোধ করছিল এতক্ষণ, কিন্তু তাঁর দীর্ঘঃশ্বাসও বিন্ধ্যের নজর এড়াল না। সে বলল,“আপনাকে অনেক ধন্যবাদ মহর্ষি নারদ। কিন্তু আপনি যেমন বললেন যে, আমি মহৎ পর্বত হতে পারতাম। আমি কি মহৎ পর্বত নই?”নারদ বুঝতে পারলেন, তিনি তাঁর প্রতিভার পরিস্ফুটন ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন।তাই তিনি তাঁর মুখে সেই মলিন ভাব বজায় রেখে ইতস্তত ভাব দেখিয়ে বললেন,“আমি তো বলতে চাই, তুমিই পর্বতদিগের মধ্যে সেরা, কিন্তু সেটা সঠিক হবে না।”বিন্ধ্য পর্বতের এবার ক্রোধের উদ্রেক হলো। সে বলল,“কেন? আমার থেকে মহৎ পর্বত আর কে আছে?”নারদ মুনি এবার তাঁর মোক্ষম চালটি চাললেন। “ওহে, মহৎ পর্বত! আমি এ কথা বলতে পারব না তোমাকে। কিন্তু তুমি সূর্যের অনেক কাছাকাছি আছ। তাকে জিজ্ঞাসা করো তিনি কোন পথে যাতায়াত করেন। তাহলেই তুমি তোমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে।”ব্যাস, হয়ে গেল অঘটনঘটনপটিয়সী নারদ মুনির মূল কাজ।এদিকে নারদ মুনির কথা অনুযায়ী ক্রোধান্বিত বিন্ধ্য সূর্যকে আহ্বান করল। সূর্যদেব তখন অস্ত যাচ্ছিলেন। বিন্ধ্য এতটাই ক্রুদ্ধ ছিল যে, সে সূর্যদেবকে প্রণিপাত পর্যন্ত করল না। বরং রাগান্বিতভাবে জিজ্ঞেস করল,“সূর্যদেব, আপনার যাত্রাপথের বিবরণ দিন আমাকে এখনই।”সূর্যদেব নারদ মুনির অনর্থের ব্যাপারে কিছুই জানতেন না, তারপরও বিন্ধ্যের রাগান্বিত চেহারা দেখে বললেন,“আমি তো প্রতিদিন পূর্ব থেকে শুরু করে পশ্চিমদিকে যাত্রা করি, এরপর মেরু পর্বতের পাশ কাটিয়ে শেষে অস্ত যাই।”তখন বিন্ধ্য বললো,“আচ্ছা, তাহলে মেরু পর্বতই সেই পর্বত! “কিন্তু আপনি তো আমার পাশ দিয়ে যাতায়াত করেন না। আমি কি ততটা গুরুত্বপূর্ণ নই?”শুনে সূর্যদেব বললেন,“নাহ বিন্ধ্য, ঠিক তা নয়। মেরু অনেক উঁচু এবং সৃষ্টির আদি থেকে আমার যাত্রাপথ একই ছিল, এখনও যেমন আছে।”এই বলে সূর্যদেব আর বেশি অপেক্ষা করলেন না, অস্তে চলে গেলেন।

এদিকে বিন্ধ্য তখন রাগে ফুঁসছে আর পর্বতের উপর জমে থাকা পাথরখণ্ডগুলোকে নিক্ষেপ করছে ভূমিতে। মেরু পর্বত তার থেকে উঁচু এবং তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ- একথাটি কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিল না বিন্ধ্য। শেষমেষ বিন্ধ্য সিদ্ধান্ত নিল সে নিজেকে মেরু পর্বতের থেকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ করে দেখাবে। যেই কথা সেই কাজ, বিন্ধ্য এবার নিজের উচ্চতা বৃদ্ধি করতে শুরু করল। কারন তাকে মেরু পর্বতের থেকেও বেশী উঁচু হতে হবে। এদিকে বিন্ধ্যের এই উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে পৃথিবী হয়ে পড়ল ভারসাম্যহীন, যা মানুষ ও দেবতা উভয়পক্ষের জন্যেই হয়ে উঠল সমস্যার কারণ। বিন্ধ্যকে থামানোর কোনো উপায় না পেয়ে শেষে দেবরাজ ইন্দ্র এলেন মুনি অগস্ত্যের কাছে। দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর অভিপ্রায় জানালেন মুনির কাছে। সব শুনে মুচকি হাসলেন অগস্ত্য মুনি। এরপর কুটিরে ফিরে এসে তিনি তাঁর স্ত্রী লোপামুদ্রা এবং পুত্রকে নিয়ে যাত্রায় বের হলেন। একসময় তাঁরা পৌঁছে গেলেন বিন্ধ্য পর্বতের সামনে। তিনি বিন্ধ্যকে আহ্বান করলেন। বিন্ধ্য নিচে তাকিয়ে দেখে যে, মুনিবর অগস্ত্য তাঁকে ডাকছেন। সে মুনিবরকে অভিবাদন জানিয়ে করে বললেন,“হে মুনিবর, আজ্ঞা করুন”।মুনি তখন বললেন,“বৎস, আমি খুবই ব্যস্ত এবং খুব শীঘ্রই আমাকে দক্ষিণে যেতে হবে। কাজেই তুমি যদি নিচু হয়ে আমাদের চলার পথ করে দাও, তাহলে আমার পথ সহজ হবে”।একথা শুনে বিন্ধ্য খুশিমনে নত হয়ে তাঁদের পথ তৈরি করে দিলো। পর্বত পার হয়ে মুনি আবার বিন্ধ্যকে ডেকে বললেন,“ওহে বিন্ধ্য। আমি খুব শীঘ্রই ফিরে আসব। কাজেই আমি না আসা পর্যন্ত যদি তুমি এভাবে থাকো, তাহলে তোমারও আবার কষ্ট করে নত হতে হবে না এবং আমাকেও তোমাকে ডাকার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না”।বিন্ধ্য মুনির কথার গূঢ় অর্থ ভালোভাবে বুঝতে না পেরেই তাঁকে বললো,“যথা আজ্ঞা মুনিবর, আপনি না আসা পর্যন্ত আমি এভাবেই থাকব।”অগস্ত্য মুনি মুচকি হেসে সেই যে দক্ষিণে চলে গেলেন, আর ফিরলেন না। আর বিন্ধ্যও মুনির অপেক্ষায় নত হয়ে থাকল অনন্তকাল। ফলে পৃথিবীতে আবার ভারসাম্য ফিরে এল। অগস্ত্য মুনির সেই যে যাত্রাই ছিল তাঁর শেষ যাত্রা । দিনটি ছিল ভাদ্র মাসের প্রথম দিন তাই সনাতন শাস্ত্রমতে প্রত্যেক মাসের প্রথম দিনটিকে অগস্ত্য দোষে দুষ্ট করে যাত্রা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বলা হয় বিন্ধ্য পর্বতকে মাথা নিচু করে থাকার নির্দেশ দিয়ে দক্ষিনে কিছুদুর যাত্রা করে যোগবলে দেহত্যাগ করে নক্ষত্রলোক প্রাপ্ত হন মহামুনি অগস্ত্য। তাই প্রতিবছর শরৎকালের শুরুতেই আকাশের দক্ষিণদিকে একটি নক্ষত্র উদিত হয়, এই নক্ষত্রকেই অগস্ত্য নক্ষত্র বলে। এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন অগস্ত্য মুনির এই চিরতরে দক্ষিণে যাত্রা করা থেকেই ‘চিরবিদায়’ অর্থে ‘অগস্ত্য যাত্রা’ শব্দগুচ্ছকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

এবার আসি অগস্ত্য মুনির বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার তথা তিনি কিভাবে আজ থেকে হাজার বছর আগে আধুনিক ব্যাটারির ধারনা দিয়েছিলেন সেই প্রসঙ্গে।

অগস্ত্য সংহিতার একটি শ্লোকে বলা হচ্ছে-

সংস্থপ্য মৃন্ময় পাত্রে তাম্রপাত্রম সুসংস্কৃতম

ছদ্যে শিখিগ্রিবেন ছরদ্রভিহ কাষ্ঠপমসুভিহ।

এর অর্থ হচ্ছে- একটি মৃত্তিকাপাত্র নাও, তাতে একটি কপার বা তামার শীট দাও এবং একটি শিখগ্রীবা স্থাপন কর। এতে কাষ্ঠগুড়ো, জিংক বা দস্তা এবং পারদ ছিটিয়ে দাও, এরপর সেখানে তার সংযুক্ত করলে তুমি মিত্রবরুনশক্তি পাবে।

এই শ্লোকের মধ্যে বিজ্ঞানীদের মূল সমস্যার জায়গাটি ছিল শিখগ্রীবা। এর সরাসরি অর্থ হচ্ছে ময়ূরের ঘাড়। কিন্তু তাতে করে তো মিত্রবরুণ শক্তি তথা বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব নয়। অবশেষে এ সমস্যার সমাধান হল। অনেক চেষ্টার পর শিখগ্রীবা শব্দটির আসল অর্থ জানতে পারলেন বিজ্ঞানীরা। আসলে এটি হচ্ছে ময়ূরের ঘাড়ের রঙের রাসায়নিক পদার্থ যাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলা হয় কপার সালফেট।

এই শ্লোকের মাধ্যমে যে ব্যাটারিটি তৈরি হল তা ডিজিটাল মাল্টিমিটারে মেপে দেখা গেল যে ব্যাটারীটি Open circuit voltage 1.38Volt এবং Free circuit current of 23 Milli Ampier প্রদান করে।

 

অগস্ত্য সংহিতার পরবর্তী শ্লোকটি ছিল –

আনেন জলভগ্নোস্তি প্রান দানেসু বায়েসু

ইবম শতনম কুম্ভনমসয়োগকারী অকৃতস্মৃতহ।

অর্থাৎ যদি এরুপ একশটি মৃত্তিকাপাত্রের তথা ব্যাটারির শক্তি আমরা ব্যবহার করি তবে জল প্রানদানকারী অক্সিজেন ও ভাসমান হাইড্রোজেন এ বিভক্ত হবে। আধুনিক বিজ্ঞানের বদৌলতে আমরা জানি যে জলে তড়িৎ চালনা করলে তা অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন এ বিভক্ত হয়!

পরের শ্লোকটি বলছে,

বায়ুবন্ধকবস্ত্রেন নিবদ্ধ য়েনমস্তকে

উদান স্বলঘুত্বে বিভর্তকষ্যয়ন্কম।

অর্থাৎ হাইড্রোজেনকে বায়ুনিরোধী কাপড়ে বন্দী করলে তাকে আকাশে উড্ডয়ন সম্ভব!

আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে একজন ঋষি সুকৌশলে যে বৈজ্ঞানিক সুত্র লিখে গেছেন সেই বস্তুর বৈজ্ঞানিক প্রয়োগ ঘটেছে অতি সাম্প্রতিককালে। যদিও অগস্ত্য সংহিতার এই শ্লোক এবং তাঁর কার্যকারিতা কিছুটা বিতর্কিত তবুও পৌরাণিক যুগে মানুষ কতটা জ্ঞানে ও বিজ্ঞানে উন্নত ছিল তা কি আজও আমরা ধারনা করতে পারি?

 

 

Leave a Reply