You are currently viewing হাজার বছর ধরে জাপানে পূজিত হচ্ছেন হিন্দু দেবতারা || Japanese Versions of Hindu Gods ||

হাজার বছর ধরে জাপানে পূজিত হচ্ছেন হিন্দু দেবতারা || Japanese Versions of Hindu Gods ||

যদি বলি আমাদের সনাতন ধর্মের বিভিন্ন দেবদেবীগণ জাপানেও পূজিত হন, তাহলে অবাক হবেন নিশ্চই। তবে যতই আশ্চর্যজনক লাগুক না কেন, কথাটি কিন্তু মিথ্যা নয়। আমাদের প্রায় সকল দেব দেবীগণ জাপানে পূজিত হন শুধুমাত্র ভিন্ন নামে। তবে তাদের আকার আকৃতি ও কর্মবৈশিষ্ট্য কিন্তু একেবারেই আমাদের সনাতন ধর্মের দেব দেবীদের মতই। প্রিয় দর্শক, সনাতন ধর্মের বিভিন্ন দেব দেবীদের সাথে জাপানী সেইসকল দেবীদের সাদৃশ্য বা মিল খুঁজতেই সনাতন এক্সপ্রেসের আজকের আয়োজন। আশা করি সম্পূর্ণ আয়োজন জুড়ে আমাদের সাথেই থাকবেন।

অনেকে বলে থাকেন সনাতন ধর্ম শুধুমাত্র ভারতীয় উপমহাদেশকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে প্রাচীন কাল থেকেই। কিন্তু ইউরোপ আমেরিকা থেকে শুরু করে সুদূর জাপানেও রয়েছে আমাদের সনাতন ধর্মের স্পষ্ট নিদর্শন। বৌদ্ধ ও শিন্তৌ ধর্মের অনুসারী এই দেশটিতে পূজিত হন প্রায় সকল সনাতন দেব দেবীগন। এই সংক্ষিপ্ত ভিডিওতে সেই সকল দেবতাদের বর্ণনা করা সম্ভব নয় বিধায় বাছাইকৃত ১০ জন জাপানী দেবতার বর্ণনা তুলে ধরা হল যারা সকলেই সনাতন ধর্মের বিভিন্ন দেব দেবীরই অন্য এক রূপ।

১. মহাকাল, মহাকালী ও দাইকোকতেন

দাইকোকতেন শব্দের অর্থ হচ্ছে  মহান ঘনকৃষ্ণ বা মহাকাল। অর্থাৎ আমাদের ভগবান শিবকে জাপানিরা জানেন ‘দাইকোকতেন’ বা ‘মাহাকারা’ হিসেবে। ‘দাইকোকতেন’ দ্বিভূজ, এক হাতে হাতুড়ি ও অন্য হাতে ঝুলি। ইনি গার্হস্থ্য জীবন, কৃষি, উর্বরতা, ও যুদ্ধের দেবতা। ঈশানাতেন রূপে তাঁর কণ্ঠে থাকে নীল রঙের সাপ ও নৃমুণ্ডমাল্য – সেই রূপে তিনি ধর্মের রক্ষক ও ঈশান কোণের অধীশ্বর। এই দাইকোকতেনের রয়েছে ছয়টি প্রধান রূপ। এর মধ্যে সনাতন ধর্ম সম্পর্কিত তার প্রথম রূপের নাম বিকু দাইকোক। তিনি পুরোহিত বা সন্ন্যাসীরুপী। তার এক হাতে হাতুড়ি, অপর হাতে বজ্র-তরবারি, এবং তিনি মঠের রক্ষাকর্তা হিসেবে পূজিত। জাপানিদের বিশ্বাস শাক্যমুনি বুদ্ধ পূর্বাবতারে মহাদেব ছিলেন। তাই বুদ্ধের পূর্বাবতার বিকু দাইকোককে পূজা করা হয় মহাদেব রূপে।

দাইকোকতেনের ২য় রূপ হচ্ছে ওইকারা দাইকোক। ভগবান শিবের পুত্র কার্তিকেয় দেবই হচ্ছেন জাপানিও দেবতা ওইকারা দাইকোক। তিনি রাজকীয় পোশাক পরিহিত, এক হাতে তরবারি, এবং অপর হাতে বজ্র। তার ৪র্থ রূপ হচ্ছে মাহাকারা দাইকোকনিয়ো। নারী-রূপিনী, পালনকর্ত্রী, এবং মাথায় ধানের ছড়ার গুচ্ছ শোভিত এই দেবী সনাতন ধর্মের ভগবতী বা মহাকালীরই রূপভেদ।

২. শ্রী হরি নারায়ন এবং নারায়েন তেন

নামের মধ্যেই কি অদ্ভূত মিল দেখেছেন? আর শুধু নামই বা কেন, দুজনের রূপকল্পেও রয়েছে বিস্তর সাদৃশ্য। দুজনেই গরুড় পাখির পৃষ্ঠে উপবেশন করে থাকেন, দুজনেই অসীম শক্তি ধারন করেন এবং দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করে থাকেন। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে এই নারায়েনতেন দেবতা তিনটি মস্তক বিশিষ্ট। সামনের সাধারন মস্তকটি ছাড়াও তার দুপাশে রয়েছে সিংহ ও বরাহ মূর্তি। এবং এই দুই মস্তক ভগবান শ্রীবিষ্ণুর বরাহ ও নৃসিংহ অবতারেরই প্রকাশ। তবে এই দেবতা বিছুতেন নামেও পূজিত হন জাপানি মন্দিরগুলোতে।

৩. প্রজাপতি ব্রহ্মা এবং বন তেন

সনাতন ধর্মে চার মস্তকধারী যে সৃষ্টিকর্তাকে আমরা দেখে থাকি, তিনিই জাপানে পূজিত হন বন-তেন নামে। ব্রহ্মার মত তিনিও চারটি মস্তক বিশিষ্ট। ব্রহ্মার নারী রূপ দেবী সরস্বতীর বাহনের মত বন তেনের বাহনও রাজ হংস। তিনি বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান ১২ জন দেবতার অন্যতম এবং আকাশের রক্ষাকর্তা। ব্রহ্মা ও বনতেনের রূপকল্পে যথেষ্ট মিল থাকলেও তাদের কার্যক্রমে রয়েছে মৃদু ভিন্নতা। তবে জাপানের এই বনতেন দেবতা সনাতন ধর্মের প্রজাপতি ব্রহ্মারই একটি বৌদ্ধ রূপ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

৪. দেবী সরস্বতী ও বেনজাই তেন

জাপানে পূজিত হওয়া ৭ জন ভাগ্য দেবতার চার জন দেবতাই হচ্ছেন হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন দেব দেবী। এই চার জন দেব-দেবীর মধ্যে রয়েছেন বিশামন বা কুবের, দাইকোকতেন বা মহাকাল, কিছিজোতেন বা শ্রীলক্ষ্মী এবং বেনজাইতেন বা দেবী সরস্বতী। আপনারা সকলেই জানেন আমাদের এই ভারতভূমিতে দেবী সরস্বতী পূজিতা হন বাগদেবী হিসেবে। তিনি বিদ্যা, সুর, সঙ্গীত, বুদ্ধি ও চারুকলার দেবী। অন্যদিকে এই দেবী সরস্বতীই জাপানে পূজিতা হন দেবী বেনজাইতেন বা বেনতেন নামে। এখানে তিনি প্রজ্ঞা, প্রতিভা ও সম্পদের দেবী। চিত্রকল্পে ও রূপকল্পেও রয়েছে সরস্বতী ও বেনজাইতেনের মধ্যে যথেষ্ঠ মিল। এমনকি এই দুই দেবীই হাতে ধরে রেখেছেন দুটি একই জাতীয় বাদ্যযন্ত্র। উল্লেখ্য, দেবী সরস্বতীর বাদ্যযন্ত্রটির নাম বীণা এবং দেবী বেনজাইতেনের বাদ্যযন্ত্রটির নাম বিওয়া।

৫. দেবরাজ ইন্দ্র ও তাইশাক তেন

বনতেন বা ব্রহ্মার মত তাইশাক তেন বা দেবরাজ ইন্দ্র হচ্ছেন জাপানীদের ১২ জন রক্ষাকর্তা দেবতাদ বা জুনিতেনদের মধ্যে অন্যতম। সনাতন ধর্মে দেবরাজ ইন্দ্র যেমন স্বর্গের রাজা তেমনই তাইশাক তেন স্বর্গীয় ৩২ জন দেবতাদের রাজা ও রক্ষাকর্তা। এছাড়াও ইন্দ্রের মত তাইশাক তেনের বাহনও হাতি। দেবরাজ ইন্দ্র যেমন দেবতা ও মানুষের রক্ষাহেতু আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ সংগ্রাম করে শান্তি ফিরিয়ে আনেন জাপানি তাইশাক তেন নামক এই দেবতা ঠিক একই ভাবে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেবতা ও মানবজাতিকে রক্ষা করেন। তবে সনাতন ধর্মে দেবরাজ ইন্দ্র যুদ্ধ, বৃষ্টি ও বজ্রের দেবতা হলেও তাইশাক তেনরূপে তিনি জাপানিদের রক্ষাকর্তা এবং সম্পদের দেবতা।

৬. বিঘ্নহর্তা গণেশ ও কাঙ্গি তেন

সমগ্র ভারতবর্ষে পার্বতী নন্দন গণেশকে সর্বাগ্রে পূজা করা হয় সুখ, সমৃদ্ধি, ও বাধা বিঘ্নহর্তা হিসেবে। কিন্তু জানেন কি জাপানেও এই একই রূপকল্পে এবং কাঙ্গি তেন নামে পূজিত হন তিনি? হ্যাঁ এখানেও তিনি হস্তীমুণ্ড বিশিষ্ট এবং সৌভাগ্যের দেবতা। শুধু তাই নয়, আপনারা জানেন ভারতবর্ষে গণপতি বাপ্পা কে বিনায়ক নামে ডাকা হয় এবং সুদূর জাপানেও তার আরেক নাম বিনায়াকা তেন। এছাড়াও কাঙ্গিতেন পারষ্পারিক ভালোবাসা এবং সন্তান প্রাপ্তির জন্য পূজিত হয়ে থাকেন জাপানে। তবে সমগ্র জাপান জুড়ে গণেশ দেব বা কাঙ্গিতেনের মূর্তি খুব একটা দেখা যায় না। সাধারনত তার মূর্তি মন্দিরের অভ্যন্তরে লুকায়িত অবস্থায় রাখা হয় এবং শুধুমাত্র কিছু শাস্ত্রীয় আচারপালন করার সময় এই দেবতার মূর্তি প্রকাশ্যে আসে। 

৭. গরুড় ও কারুয়া

আপনারা একটু আগেই জেনেছেন সনাতন ধর্মের শ্রীহরি নারায়ন ও জাপানি নারায়েন তেন দুজনেই একটি বিশেষ পক্ষীর উপরে উপবেশন করেন। এখানে নারায়নের বাহন যেমন গরুড় পাখি, তেমনই নারায়েন তেনের বাহন পক্ষিটির নামও কারুয়া। মানুষের মত শরীর ও পাখির মত মুখ বিশিষ্ট এই প্রাণিটির নিশ্বাসে বেরিয়ে আসে আগুনের হলকা। গরুড় যেমন সর্পজাতীয় প্রাণীকে নাশ করে থাকেন কারুয়ার কার্যক্রম অনেকটা সেরকমই।   

৮. যমরাজ ও এনমা তেন

সনাতন ধর্মের যম বা যমরাজের জাপানি সংস্করন হচ্ছেন এনমা তেন। যমরাজের মত তিনিও মৃত্যু পরবর্তী জীবনের দেবতা। মানুষের জীবদ্দশায় করা সকল পাপ পুণ্যের হিসেব করে তাদেরকে পুরষ্কার বা তিরষ্কার করাই তার কাজ। এই এনমা তেন দেবতা নরকের রাজা। এছাড়াও তিনি জাপানি বৌদ্ধ ধর্মের ১২ জন প্রধান দেবতাদের মধ্যে অন্যতম। সনাতন ধর্মের বিভিন্ন চিত্রকল্পে যমরাজকে যেমন ভয়ংকরদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তেমনই এনমা তেনের মুর্তিকল্পে দেখা যায় বীভৎসতার ছাপ।

৯. অপ্সরা ও তেননিন

আপনারা নিশ্চই অপ্সরাদের নাম শুনে থাকবেন। স্বর্গীয় এই মোহনীয় নারীগন গন্ধর্বদের সঙ্গীনী এবং স্বর্গে মনোহর নৃত্য-গীত পরিবেশ্ন করে থাকেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে জাপানি বৌদ্ধ ধর্মেও রয়েছে অপ্সরাদের সরব উপস্থিতি। তবে এখানে তাদেরকে ডাকা হয় তেননিন নামে। তারা স্বর্গীয় নারী হিসেবে বসবাস করেন এবং তাদের রয়েছে উড়তে পারার ক্ষমতা। স্বর্গে তারা মূলত বুদ্ধা ও বোধিসত্ত্বদের সঙ্গিনী হিসেবে বিচরণ করে থাকেন। কোন কোন মতে উড়ে বেড়ানোর জন্য তাদের রয়েছে পরীদের মত পাখা। এবং উড়ে বেড়ানোর সময় তাদের হাতে থাকে পরিস্ফুটিত লাল পদ্ম। আবার কেউ কেউ বলে থাকেন, তারা অনেকেই উচু পাহাড়ের উপরে বসবাস করেন এবং অনেক পূণ্যার্থী এই মহাত্মাদের সাথে সাক্ষাত করার উদ্দেশ্যে পর্বতারোহণও করে থাকেন।

১০. দেবী শ্রী লক্ষ্মী ও কিছিজো তেন

জাপানি বৌদ্ধ ধর্মে দেবী শ্রীলক্ষ্মীর পরিবর্তিত নাম কিছিজো তেন। তিনি জাপানি ৭ জন ভাগ্যদেবতার মধ্যে অন্যতম এবং তিনি মূলত মহিলাদের দ্বারাই পূজিত হন। সনাতন ধর্মের দেবী শ্রীলক্ষমীর মত তিনিও জাপানে উর্বরতা, সৌন্দর্য, ফসল, মেধা ও সৌভাগ্যের দেবতা। এছাড়াও লক্ষ্মী ও কিছিজোতেনের অন্যান্য সাদৃশ্যের মত তারা দুজনেই অধিষ্ঠান করেন পদ্ম ফুলের উপরে।

প্রিয় দর্শক, শুধু এই দশ জনই নন সনাতন ধর্মের প্রায়  শতকরা ৮০ ভাগ দেবতাই জাপানে পূজিত হন ভিন্ন নামে বা উদ্দেশ্যে। যা এই একটি মাত্র ভিডিওর মাধ্যমে বর্ণনা করা অসম্ভব। এছাড়াও গ্রীক পুরাণে বর্ণিত দেবতাদের সাথেও রয়েছে সনাতন ধর্মীয় দেবতাদের আশ্চর্যজনক সব মিল। আপনাদের আগ্রহ থাকলে আগামী কোন এক ভিডীওতে কথা বলব সেইসব গ্রীক দেবতাদের নিয়েও। তবে এ থেকে একটি বিষয় খুব সহজে অনুধাবন করা যায়, সনাতন ধর্মের শেকড় কত গভীরে প্রেথিত।

Leave a Reply