You are currently viewing পঞ্চতত্ত্ব কারা? শ্রীচৈতন্য, নিত্যানন্দ,অদ্বৈতাচার্য, গদাধর,ও শ্রীবাসের আসল পরিচয় || Pancha Tattva

পঞ্চতত্ত্ব কারা? শ্রীচৈতন্য, নিত্যানন্দ,অদ্বৈতাচার্য, গদাধর,ও শ্রীবাসের আসল পরিচয় || Pancha Tattva

শ্রীগৌরাঙ্গ প্রথম তত্ত্ব বুঝিতেই হয়।

নিত্যানন্দ তাঁর পরে সদা মনে রয়।।

তৃতীয়তে শ্রীঅদ্বৈত তত্ত্ব বুঝ সবে।

গদাধর পণ্ডিতেরে চতুর্থ ধরিবে।।

শ্রীবাস পঞ্চতত্ত্ব নাহি কেহ আর।

কেশবের পঞ্চতত্ত্ব ইহা জেন সার।।

গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতে, শ্রীভগবান নিজেকে আধ্যাত্মিক গুরু, ভক্ত, বৈচিত্র্যময় শক্তি, অবতার এবং পূর্ণ অংশ পঞ্চতত্ত্ব রূপে প্রকাশ করে উপভোগ করেন। এইকারনে পঞ্চদশ শতকে পৃথিবীতে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ  পাঁচটি অবতারে প্রকাশ হয়েছিলেন এবং এঁদেরকেই বলা হয় পঞ্চতত্ত্ব। এরা হলেন চৈতন্য মহাপ্রভু, নিত্যানন্দ,অদ্বৈত আচার্য , গদাধর পণ্ডিত ও শ্রীনিবাস ঠাকুর ।পঞ্চতত্ত্ব একটু জটিল তবুও আপনাদের জন্য সাধ্যানুযায়ী বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছি।

 

চৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থে কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী বলেছেন “ এই পাঁচটি তত্ত্বের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তবুও, আধ্যাত্মিক বৈচিত্রের স্বাদ নিতে হলে তাদের মধ্যে পার্থক্য করা উচিত” পঞ্চতত্ত্বের উদাহরণ দিতে গিয়ে বলা হচ্ছে- প্রথমে একটি মোমবাতি থেকে অন্য একটি বাতি জ্বালানো হল, আবার দ্বিতীয়টা থেকে আর  একটা বাতি জ্বালানো যাবে। তৃতীয়টা  থেকে আবার  একটা। ঠিক তেমনি, ভগবানের অংশ প্রকাশ কিংবা  অবতার যাই হোক, সবই হল ঐ বাতির মতো । আদি বাতিটা হলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। কিন্তু ভগবানের একটি বিস্তার রূপ থেকে অন্য একটি বিস্তার রূপে শক্তি যে কম থাকে তা ঠিক নয়। বাতির আলো সব কটিতেই সমান থাকে। এটিই মূলত পঞ্চত্তত্বের গুঢ় তত্ত্ব।

শাস্ত্র বলছে,

কৃষ্ণের নাম হৈতে হবে সংসার মোচন।

কৃষ্ণনামম হৈতে পাবে কৃষ্ণের চরণ।।

বৈষ্ণবমতে, এই কৃষ্ণ নাম তথা হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র হচ্ছে পরম তত্ত্বের চিন্ময় শব্দাবতার। হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপের অর্থ তৎক্ষণাৎ সরাসরি কৃষ্ণ সঙ্গ লাভ। তবে এই মহামন্ত্র জপের পূর্বে পঞ্চত্ত্বের মন্ত্র পাঠ করে তারপর মহামন্ত্র জপ করেন বৈষ্ণবগণ-

জয় শ্রী-কৃষ্ণ-চৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ

শ্রী-অদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি-গৌর-ভক্ত-বৃন্দ

হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, হরে হরে

হরে রাম, হরে রাম, রাম রাম, হরে হরে।

অর্থাৎ, হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপের আগেই স্মরণ করা হচ্ছে এই পঞ্চতত্ত্বকে। কিন্তু কেন? কি কারণে এই পঞ্চতত্ত্ব জগতে এত ভক্তির সাথে কির্তীত হন? পঞ্চতত্ত্বের প্রকৃত পরিচয়ই বা কি? এ সকল প্রশ্নের উত্তর থাকছে আজকের ভিডিওতে। আশা করি সম্পূর্ণ ভিডিওটি মনযোগ সহকারে দর্শন ও শ্রবন করবেন।

আরও পড়ুনঃ জলের নিচে শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা

গৌরতত্ত্ব

লীলা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সর্বশক্তিমান ও সর্বকারনের আদি কারন। তাঁর থেকেই প্রকাশিত হয়েছে অনন্ত শক্তি, যেমন – সৃষ্টিশক্তি, লীলাশক্তি, ইচ্ছাশক্তি, জীবশক্তি, মায়াশক্তি, শ্রী যোগমায়াদি ষোড়শ শক্তি, অন্তরঙ্গা শক্তি ইত্যাদি। চিন্ময় জগত গোলোকের সমস্ত কার্যকলাপ শ্রীকৃষ্ণের অন্তরঙ্গা শক্তির দ্বারা সম্পন্ন হয়। এই অন্তরঙ্গা শক্তি তিন ভাগে বিভক্ত তথা সন্ধিনী শক্তি, সম্বিৎ শক্তি ও হ্লাদিনী শক্তি। সন্ধিনী শক্তির সাহায্যে সমস্ত চিৎ-জগৎ প্রকাশিত হয়েছে, সম্বিৎ শক্তি বা জ্ঞান শক্তির দ্বারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে জানতে পারেন এবং কৃষ্ণভক্তেরা এই শক্তির সাহায্যে শ্রীকৃষ্ণকে জানতে পারেন। আর হ্লাদিনী শক্তির দ্বারা শ্রীকৃষ্ণ দিব্য আনন্দরস আস্বাদন করেন এবং ভক্তরা এই হ্লাদিনী শক্তির কৃপায় কৃষ্ণপ্রেমের সমুদ্রে অবগাহন করতে পারেন। যারা রাধা এবং কৃষ্ণকে আলাদা মনে করে থাকেন এবং যারা গৌরতত্ত্ব ভালোভাবে বুঝতে চান তাঁদের জন্য এই হ্লাদিনী শক্তি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত আবশ্যক।

তো হ্লাদিনী শব্দটির অর্থ হচ্ছে আনন্দদায়িনী শক্তি। অর্থাৎ, যে-স্বরূপশক্তির বলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজে আনন্দিত হন এবং অপর সকলকেও আনন্দ দান করেন সেটিই হচ্ছে হ্লাদিনী শক্তি। এই হ্লাদিনী শক্তির মূর্ত অবস্থা হচ্ছেন শ্রীমতী রাধা রাণী। আরও সহজভাবে বলতে গেলে শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি যে রূপ ধারন করেছিলেন সেটিই হচ্ছে শ্রীমতী রাধারাণী। অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারানী চর্মচক্ষুতে দুইজন পৃথক ব্যক্তি বলে দৃষ্ট হলেও তাঁদের মধ্যে বিন্দুমাত্র তফাৎ নেই।

অন্তরে শ্রীকৃষ্ণ রাখি

রাধার গোরা রূপ অঙ্গে ধরি

মর্ত্ত্যলোকে নেমে এল

নদের নিমাই।

এবার আসি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বা গৌরতত্ত্ব প্রসঙ্গে। 

শ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু হচ্ছেন রস আশ্রয় তত্ত্ব বিগ্রহ। তিনি শুদ্ধ ভগবৎ প্রেমে অনুভূত পরমাস্বাদ্য দিব্য ভাব তথা মাধু্র্যাদি রসের আশ্রয়। পুরাকালে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর হ্লাদিনী শক্তি আলাদা বিগ্রহে ভূলোকে পরিগ্রহ করেছিলেন। মূলত শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারানীর মধ্যে যে কোন পার্থক্য নেই তা আপনার পূর্বের আলোচনা থেকে জানতে পেরেছেন।  কিন্তু কলিযুগে এসে শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর হ্লাদানীশক্তি আবারও এক হয়ে শ্রীচৈতন্যেদেবের মধ্যে প্রকট হয়েছেন। অর্থাৎ রাধার গৌরকান্তি ও কৃষ্ণপ্রেম সঙ্গে নিয়ে সমুদ্র থেকে চন্দ্রের মত শচীনন্দনরূপে শ্রীচৈতন্যদেব উদিত হয়েছেন। অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণই শ্রীরাধার ভাবযুক্ত হয়ে চৈতন্যরূপে জন্ম নিয়েছেন তিনটি সাধ পূরণের জন্য –

  • প্রথম সাধ – শ্রীরাধার প্রণয় মহিমা কিরূপ?
  • দ্বিতীয় সাধ – সেই প্রেমের দ্বারা আমার যে অদ্ভূত মাধুর্য্য তিনি আস্বাদ করেন তাহাই বা কিরূপ
  • তৃতীয় সাধ – আমাকে অনুভব করিয়া বা আস্বাদন করিয়া ইঁহার যে সুখ হয় তাহাই বা কিরূপ

এই তিন কারণে অনাদির আদি গোবিন্দ দীনহীনের বেশে নেমে এসেছিলেন মর্তলোকে। তাঁর পাদস্পর্শে ধন্য হয়েছিল সম্পূর্ন জগৎ। ১৪৮৬ খ্রীষ্টাব্দে পিতা জগন্নাথ মিশ্র ও মাতা শচীদেবীর ঘর আলো করে নদের চাঁদ অবতরন করেছিল আমাদের এই মর্ত্ত্যে। পল্লীতে পল্লীতে, হাটে মাঠে ঘাটে, কাঙালের মত হরিনাম সংকীর্ত্তন করে ও মহিমা প্রচার করে বেড়িয়েছিলেন তিনি। তাঁর মতে

হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কেবলম্।

কলৌ নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব গতিরন্যথা।

অর্থাৎ হরিনাম, হরিনাম, এবং কেবলমাত্র হরিনাম কীর্তনই কলিযুগের মানুষের একমাত্র পথ। এ ছাড়া অন্য কোন গতি বা উপায় নেই, নেই, নেই।

আর সেই হরিনাম তথা হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রটি হচ্ছে-

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।

হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।

 

 

নিত্যানন্দ তত্ত্ব

নিতাই, অবধূত বা প্রভু শ্রী নিত্যানন্দ হচ্ছেন প্রেম আশ্রয়, তিনি কৃষ্ণপ্রেমের আশ্রয় বিগ্রহ। পঞ্চতত্ত্বের মধ্যে তিনি ভক্ত স্বরূপ। ১৪৭৪ সালের মাঘ মাসে শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে বীরভূম জেলার অন্তর্গত একচক্রাগ্রামে আবির্ভূত হয়েছিলেন প্রভু নিত্যানন্দ। তাঁর পিতা ছিলেন – হাড়াই পন্ডিত বা হাড়াই ওঝা এবং মাতা ছিলেন পদ্মাবতী দেবী। ত্রেতা যুগে যিনি ছিলেন শ্রীরামের লক্ষন, দ্বাপরে যিনি হয়েছিলেন কৃষ্ণের বলরাম, কলিতে তিনি হয়ে এলেন গৌরের নিতাই। তবে মহাপ্রভুর আবির্ভাবের প্রায় ১২ বছর আগে তাঁহার আবির্ভাব। তাঁর পূর্বনাম ছিল কুবের। কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর স্পর্শে কুবের থেকে হয়ে উঠলেন প্রভু শ্রী নিত্যানন্দ। এই স্পর্শে তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর চেয়েও বেশি করুণাময় হয়ে উঠেছিলেন। এর কারণ হিসেবে জগাই মাধাই এর ঘটনাটির উল্লেখ করা যেতে পারে।

একদিন শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু এবং হরিদাস ঠাকুর নগর সংকীর্তনে বের হয়েছিলেন। নবদ্বীপের পথে পথে গুঞ্জরিত হচ্ছিল তাঁদের সুমধুর হরিনাম সংকীর্ত্তন। তাঁরা পথচারীদেরকেও অনুরোধ করছিলেন এই সুমধুর নাম জপ করতে।  এমন সময় তাঁরা সম্মুখীন হলেন জগাই-মাধাই নামক দুই ভাইয়ের। প্রবল আসুরিক প্রবৃত্তিসম্পন্ন এই ভ্রাতাগণ হেন কোন পাপকার্য ছিল না যা এরা করেনি। মদ্যপান, জোরপূর্বক পরনারী সম্ভোগ, মাংসাহার, হত্যা, লুটপাট সবকিছুই নির্দ্বিধায় চালিয়ে যাচ্ছিলেন এই দুই দুর্বৃত্ত ও দুর্বিনীত সহোদর। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু এবং হরিদাস ঠাকুর এই দুই ভাইকে অনুরোধ করলেন মধুর হরিনাম সংকীর্ত্তন করার জন্য। জগাই মাধাই হরিনাম শুনেই অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন। তাঁরা প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁদের বহন করা মদিরা পাত্রের কানা দিয়ে সজোরে আঘাত করলেন নিত্যানন্দের কপালে। কপাল ফেটে ছুটল রুধির ধারা। কিন্তু নিত্যানন্দ প্রভুর কি অপার করুনা, তিনি প্রতিবাদ তো দূরে থাকে জগাই মাধাইকে আলিঙ্গন করে বলে উঠলেন “মেরেছিস কলসির কানা, তাই বলে কি প্রেম দেব না?” অর্থাৎ, নিজের শরীর যারা রক্তাক্ত করেছে তাঁদের কাছেই তিনি প্রেমভক্তি বিলিয়ে বেড়াচ্ছেন। এদিকে নিতাইয়ের এই সংবাদ শুনে ছুটে এলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে তিনি প্রহার করতে উদ্যত হলেন এই দুই পাষণ্ড ভ্রাতাগনকে। এসময় শ্রী নিত্যানন্দ জগাই মাধাই এর জন্য নিজে শ্রীমন্মহাপ্রভুর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করলেন এবং শ্রীচৈতন্যদেবকে তাঁর মর্ত্ত্যে অবতরনের উদ্দেশ্য মনে করিয়ে দিলেন। এ দৃশ্য দেখে জগাই মাধাই এর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হল মধুর হরিনাম, উদ্ধার হয়ে গেল এই দুই মহাপাপী। তাই বলা হয়, উদার কৃপাময় শ্রী নিত্যানন্দ প্রভুর নিকট ক্রন্দন, সকাতরে তার দয়া ভিক্ষা এবং সোল্লাসে “নিতাই গৌরাঙ্গ” কীর্তনের ফলে যে কোন ভক্ত দ্রুত প্রেম -নাম জপের স্তরে উন্নীত হতে পারেন।

আরও পড়ুনঃ বৈষ্ণব কে? তুলসী মালা, তিলক, গেরুয়া ধারন করলেই কি বৈষ্ণব হওয়া যায়? Who is Vaishnava?

শ্রীঅদ্বৈত তত্ত্ব

পঞ্চতত্ত্বের তৃতীয় তত্ত্ব হচ্ছেন শ্রীঅদ্বৈত তত্ত্ব। তিনি পরম ভগবান হরি থেকে আলাদা নন বলেই তাঁকে অদ্বৈত বলা হয় এবং কৃষ্ণভাবনা প্রচার করায় তাঁকে আচার্য বলা হয়। পঞ্চতত্ত্বের মধ্যে তিনি ছিলেন ভগবান এবং ভগবানের ভক্তের অবতার তথা ভক্তাবতার। বলাই বাহুল্য ভক্তি কল্পতরুর প্রধান স্কন্ধস্বরূপ। বৈষ্ণবমতে তিনি হলেন মহাবিষ্ণু ও সদাশিবের মিশ্র অবতার। চৈতন্যচরিতামৃতে বলা হচ্ছে, “শ্রী অদ্বৈতাচার্য প্রভু শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুর অংশাবতার ইহার পাদপদ্মে আমি কোটিবার নমস্কার করি  ”

শ্রীহট্ট তথা বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট জেলার লাঊড় গ্রামের এক বারেন্দ্র ব্রাহ্মণকুলে আবির্ভূত হন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাবের অনেক আগেই। তাঁর গার্হস্থ্য নাম ছিল কমলাক্ষ মিশ্র, পিতা কুবের পন্ডিত ও মাতা ছিলেন লাভা দেবী। সহধর্মিনী হিসেবে পেয়েছিলেন – সীতা দেবী ও শ্রীদেবীকে। গুরু মাধবেন্দ্র পুরীর হাত ধরে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর জগতে তিনি অদ্বৈতাচার্য নামে খ্যাত হন।তিনি এই বিষয়াসক্ত সমাজে বিতরন করতে চেয়েছিলেন কৃষ্ণপ্রেম ও আধ্যাত্মিক চেতনা। কিন্তু এ কাজ অত্যন্ত জটিল এবং দুঃসাধ্য। তিনি বুঝতে পরেছিলেন স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া এই কাজ তাঁর অসাধ্য।

কিছুকাল পূর্বে অদ্বৈতাচার্য নেপালের গণ্ডকী নদীর একটি নারায়ণ শিলা প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তিনি গঙ্গাজল এবং তুলসীমঞ্জরী দ্বারা সেই শালগ্রামশিলার অর্চনা শুরু করলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে মর্ত্ত্যে অবতীর্ণ করা। তাঁর উপবাস, উচ্চৈঃস্বরে কৃষ্ণনাম কীর্তন ও কঠোর তপস্যায় সাড়াও দিয়েছিলেন জগতের নাথ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। আর তাঁর ফলেই শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম। তাই বলা হয় শ্রীঅদ্বৈতাচার্যের প্রেম হুংকারেই মহাপ্রভুর আবির্ভাব।

অদ্বৈত আচার্য, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং শ্রী নিত্যানন্দ প্রভু এই তিনজন বিষ্ণুতত্ত্বে রয়েছেন, তাই তাঁদেরকে তুলসী পত্র অর্পণ করা হয়। আবার শ্রী অদ্বৈত  হচ্ছেন পাঞ্চরাত্রিক বিধি আশ্রয়ের প্রতিভূ, যে বিধিতে গায়ত্রী, দীক্ষা, অর্চনা এবং বৈধী ভক্তির কঠোর বিধি নিয়মাদি অন্তর্ভুক্ত। এবং তাঁর কৃপা ভিন্ন কেউই হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ পরিশুদ্ধ করতে পারেনা। এছাড়াও পুরীর রথযাত্রার এক মহেন্দ্রক্ষণে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীদের সমাবেশে তিনিই সর্বপ্রথম শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অবতার হিসেবে ঘোষনা করেন। ভারতের ইতিহাসে ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম আচার্য ও সাধক বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী হচ্ছেন শ্রীঅদ্বৈতাচার্যের একজন বংশধর।

 

শ্রীগদাধর তত্ত্ব

শ্রী গদাধর পণ্ডিত গোস্বামী হচ্ছেন পঞ্চতত্ত্বের চতুর্থ ও শক্তিতত্ত্ব। ব্রজলীলায় তিনি ছিলেন শ্যামসুন্দরবল্লভা বৃন্দাবনলক্ষ্মী তথা শ্রীশ্রীরাধারাণী এবং ললিতাও তাঁর মধ্যে সন্নিবিষ্টা ছিলেন। এছাড়াও গদাধরের মধ্যে রুক্মিণীদেবীরও প্রভাব পরিলক্ষিত।

অন্তরঙ্গ ভক্ত করি গমণ যাঁহার।।

যাঁহা সভা লৈয়া প্রভুর নিত্য বিহার।

যাহা সভা লৈয়া প্রভুর কীর্ত্তন প্রচার।।

যাঁহা সভা লৈয়া করেন প্রেম আস্বাদন।

যাঁহা সভা লৈয়া দান করেন প্রেমধন।।

“শ্রী কৃষ্ণের আনন্দ শক্তি বা হ্লাদিনীশক্তিরূপে  যিনি পূর্বে বৃন্দাবনেশ্বরী রাধারানী রূপ পরিগ্রহ করেছিলেন, তিনিই কলিতে ভগবান চৈতন্য মহাপ্রভুর আমোদ-প্রমোদে শ্রী গদাধর পণ্ডিত রূপে মূর্ত হলেন। শ্রী স্বরূপ দামোদর গোস্বামী উল্লেখ করেছেন যে কৃষ্ণের প্রসন্ন শক্তি তথা লক্ষ্মীর আকারে তিনি পূর্বে শ্যামসুন্দর-বল্লভা হিসাবে ভগবানের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। সেই শ্যামসুন্দর-বল্লভা এখন গদাধর পণ্ডিত হিসেবে উপস্থিত। পূর্বে, ললিতা-সখী হিসাবে, তিনি সর্বদা শ্রীমতি রাধারাণীর প্রতি ভক্ত ছিলেন।

মোদ্দাকথা হচ্ছে শ্রীগদাধর পণ্ডিত হচ্ছেন ভক্তি শক্তি এবং অভ্যন্তরীণ শক্তির অবতার যিনি শক্তিতত্ত্ব, বিষ্ণুতত্ত্বের গোপন উপাসক।এই অবতারে, রাধারানী তার প্রভুর সাথে ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসাবে সময় কাটাতে সক্ষম হয়েছিলেন যিনি শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর বিনোদন এবং মহিমা ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছিলেন।

শ্রীগদাধরের পণ্ডিতের আবির্ভাব হয়েছিল  শ্রীমাধব মিশ্র এবং রত্নাবতী দেবীর ঘরে। ব্রজের গোপিনী ও বৃন্দাবনলক্ষ্মীর মত তিনি ছোট বেলা থেকে শ্রীগৌরসুন্দরের সাথে জীবনের এক দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। শিশু লীলার সময় গৌরহরি গদাধরকে  সঙ্গে নিয়ে কখনো নিজ অঙ্গনে কখনো বা গদাধরের গৃহে বিবিধ লীলা খেলা করতেন । এছাড়াও গ্রামের পাঠশালায় তাঁরা উভয়ে একসাথে অধ্যয়নও করতেন  । চৈতন্য গবেষকদের মতে শ্রী গদাধর পণ্ডিত হচ্ছেন ভাবাশ্রয় তত্ত্ব। পূর্ণ কৃষ্ণপ্রেম লাভের প্রারম্ভিক স্তর ভাব এর আশ্রয় বিগ্রহ। শুদ্ধভাবে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ এবং ভাবভক্তির স্তরে উন্নীত হওয়ার জন্য ভক্তের উচিত সর্বদাই শ্রীগদাধর পণ্ডিতের নাম গ্রহন, স্মরণ ও তাঁর নিকট প্রার্থনা করা।

আরও পড়ুনঃ শুদ্ধভাবে গীতা পাঠ করার সহজ ও সঠিক উপায় || গীতার ১৮ টি নাম মাহাত্ম্য || গীতাপাঠের ফল।

শ্রীবাস পন্ডিত তত্ত্ব

পঞ্চতত্ত্বের মধ্যে পঞ্চম ও শেষতত্ত্ব অর্থাৎ শুদ্ধ ভক্ত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন শ্রীবাস পণ্ডিত। গৌর গণোদ্দেশ দীপিকা অনুসারে তিনি দেবর্ষি নারদের অবতার এবং বৈষ্ণবীয় বিখ্যাত ছয় চক্রবর্তীর অন্যতম।  শাস্ত্রে বলা হচ্ছে

শ্রীবাসাদি যত কোটি কোটি ভক্তগণ।

শুদ্ধ-ভক্ত-তত্ত্ব মধ্যে সবার গণন।।

অর্থাৎ, তিনি হলেন ভগবানের প্রান্তিক শক্তি তথা জীব তত্ত্ব এবং একই সাথে সমস্ত শুদ্ধ অনুরাগী ভক্তদের নেতা। শ্রীবাস ঠাকুরের নেতৃত্বে ভগবানের অগণিত শুদ্ধ ভক্ত আছেন, যাদেরকেও অবিকৃত ভক্ত হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এমনকি শ্রীবাস ঠাকুরের গৃহপালিত প্রাণীগুলোও শুদ্ধ ভক্তের সংসর্গে তথা শ্রীবাস ঠাকুরের সংসর্গে মুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

শ্রীবাস পন্ডিতের গৃহে দুঃখী নামে এক দাসী ছিলেন। তিনি প্রতিদিন গৃহের বিভিন্ন সেবামূলক কাজের পাশাপাশি মহাপ্রভুর স্নানের জল আনতেন। একদিন শ্রীগৌরসুন্দর শ্রীবাস পণ্ডিতকে জিজ্ঞাসা করলেন “জল কে আনে?”
শ্রীবাস পণ্ডিত বললেন- দুঃখী আনে।
শ্রীগৌরসুন্দর বললেন- আজ থেকে ওর নাম সুখী। যারা ভগবানের ও ভক্তের সেবা করে, তারা কোনভাবেই দুঃখী হতে পারে না, তারা অবশ্যই সুখী। এই ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় মহাপ্রভু ও তাঁর ভক্তের কি অপার মাহাত্ম্য।

আপনারা অনেকেই হয়ত জানেন না, যে দিগ্বিজয়ী মনোহরশাহী শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে সমগ্র বিশ্ব মুগ্ধ হয়েছে, সেই কীর্তনের জন্মস্থান শ্রীবাসের আঙিনায়। অর্থাৎ এই হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের যে ভক্তি আন্দোলন তা সেই শ্রীবাস পন্ডিতের ছোট্ট আঙ্গিনা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল যা আজ পৌছে বিশ্বের প্রত্যেক প্রান্তে।

একদিন মধ্যাহ্নে শ্রীবাস ঠাকুর ঘরের দরজা বন্ধ করে শ্রীনৃসিংহদেবের ধ্যান করছিলেন। এমন সময় ঠাকুর ঘরের দরজায় অস্থিরভাবে বার বার আঘাত করে কে যেন বলতে লাগল “শ্রীবাস দ্বার খোল”। শ্রীবাস বিরক্ত মনে জিজ্ঞাসা করলেন কে তুমি? বাইরে থেকে উত্তর এলো তুমি যাকে ধ্যান করছ, আমি সেই। একথা শোনার সাথে সাথে দরজা খুললেন শ্রীবাস, দেখলেন বাইরে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু দাঁড়িয়ে। তিনি শ্রীবাসকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে  ঠাকুরঘরে প্রবেশ করে বিষ্ণুখট্টায় যে শালগ্রাম শীলাটি ছিল তা এক পাশে সরিয়ে রেখে বসে পড়লেন। স্তম্ভিত হলেন শ্রীবাস, একি করছেন নিমাই? তাঁর বিষ্ময় আরও বাড়ল যখন তিনি দেখলেন শ্রীমন্মহাপ্রভুর সর্ব অঙ্গ থেকে বিপুল তেজরাশি নির্গত হচ্ছে। বিষ্ময়ের আতিশয্যে যেন বাক শক্তি হারিয়ে ফেললেন শ্রীবাস। মহাপ্রভু বললেন “শ্রীবাস, আমি যাচ্ছি তুমি আমাকে অভিষেক কর।” অর্থাৎ তিনিই যে স্বয়ং পরমেশ্বর তা নিজ মুখেই শ্রীবাসকে বলে গেলেন মহাপ্রভু। আর এভাবেই শুদ্ধ ভক্তের কাছে পূজা-অভিষেক গ্রহন করার জন্য ভগবান সর্বদাই উৎসুক থাকেন। তবে একটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য- শ্রীগদাধর পণ্ডিত ও শ্রীবাসপণ্ডিত বিষ্ণুতত্ত্বের বাইরে অবস্থান করায় তাঁদেরকে তুলসী পত্র অর্পণ করা হয় না। সুতারাং পঞ্চতত্ত্বের শ্রীবাস ঠাকুর হচ্ছেন শুদ্ধনামাশ্রয় এর প্রতিভু বিগ্রহ। শ্রীবাস ঠাকুরের নাম গ্রহন ও তাঁর নিকট প্রার্থনার মাধ্যমে তাঁর কৃপা লাভ করা যায় এবং শ্রীকৃষ্ণের শুদ্ধনাম জপ করার সামর্থ্য লাভ হয়

সবশেষে চৈতন্য চরিতামৃত থেকে একটি শ্লোক দিয়ে শেষ করতে চাই-

চৈতন্য নিত্যানন্দ নাহি এসব বিচার।

নাম লৈতে প্রেম দেন,বহে অশ্রুধার।

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে

হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।

হিন্দু বা সনাতন ধর্মীয় সকল প্রকার তথ্য, আচার-নিয়ম, সংস্কৃতি, আখ্যান ও উপাখ্যান জানতে আমাদেরকে ইউটিউবে বা ফেসবুকে ফলো করতে পারেন।

Leave a Reply