You are currently viewing হিন্দু পুরুষ একাধিক বিবাহ করতে পারলেও নারী কেন পারে না এবং বিবাহ-বিচ্ছেদেরও অধিকার নেই কেন?

হিন্দু পুরুষ একাধিক বিবাহ করতে পারলেও নারী কেন পারে না এবং বিবাহ-বিচ্ছেদেরও অধিকার নেই কেন?

|| বিবাহ সংস্কার ||

বিবাহ জিনিসটা এই কালে যতো সহজ ভাবে দেখা হয়, আগে তা ছিলো না। তখন জিনিসটা অনেক পবিত্র বলে ভাবা হতো। বলতে খারাপ লাগলেও এখন বিবাহ বলতে দায়িত্ব বা সংসারের বদলে সুখ স্বাচ্ছন্দই বেশি দেখে। বিবাহ জিনিসটা আসলে এতোটা খেলা কথা নয় যে আজকে একজনকে ভালো লাগলো বিয়ে করে ফেললাম। কালকে মনে হলো ঠিক যাচ্ছে না তাই ছেড়ে দিলাম। কথায়ই তো আছে ,

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালু কণা বিন্দু বিন্দু জল,

গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল।

তেমনি কয়েকজন লোক নিয়ে যেই পরিবারটা গড়ে উঠে সেই ছোট ছোট মানুষের সমষ্টিই দেশটাকে বানায় আর মানবকূল। জিনিসটা ছোট লাগলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আর তার মধ্যে সামান্যতম সমস্যাটাই ক্যান্সারের মতো। একটাতে লাগলে অন্যটাতে লাগতে বেশিদিন সময় লাগে না। আর সমগ্র জাতিকেই ধ্বংস করে দেয়। হিন্দু মুনি ঋষিরা তা অনেক আগেই বুঝেছিলেন বলে সমাজপতিদের প্রত্যেকটা পরিবার নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন। এতো সুষ্ঠু ব্যবস্থা আর কোথাও দেখা যায় না, যেখানে যদি সকলের জ্ঞান লাভের সক্ষমতা নাও থাকে বা উক্ত বিষয়ে অজ্ঞ তাদের পরিবারকে সাহায্য করবে এমন একজন জ্ঞানী ব্রাহ্মণ নিযুক্ত করা থাকে। সেই ব্রাহ্মণই তাদের সব উপায় বলে দেবে। বলতে গেলে সমাজটা ঠিক রাখার জন্য সবাইকেই নিযুক্ত করার একটা ভালো উপায়।

[বি.দ্র.— এটা প্রাচীণ যুগেই করা হয়েছে। যা মধ্যযুগে স্বার্থচিন্তার কারণে সব বিষিয়ে গেছে যার কারণে এতো সুন্দর ব্যবস্থাটা এখন মানুষ দেখতে পায় না]

পিতৃতান্ত্রিক সমাজ হলেও নারীর সম্মান বা গুরুত্ব যে কম নয় তা মনুস্মৃতিই বলে দেয়, “পিতা, ভ্রাতা, বর, দেবর তথা স্বামীর ভ্রাতৃবর্গ যারা (নিজেদের) মঙ্গলেকামনা করে, তাদের অবশ্যই নারীদের মর্যাদা দিতে হবে তথা শোভিত করতে হবে। যে স্থানে নারীদের সম্মান দেওয়া হয়, সে স্থানে দেবতারাও সন্তুষ্ট থাকে৷ অন্যথায় বিপরীত হয়।

যে পরিবারে নারী দুঃখের সাথে বসবাস করে, সেই পরিবার অতি শীগ্রই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে, অন্যথায় সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পাবে।”

(মনুস্মৃতি, ৩/৫৫-৫৭)

নারী শিক্ষা আদি যাবতীয় সব ব্যবস্থাই আছে বলা চলে। তেমনি তাদের কাজের মধ্যেও সমবণ্টনের খেয়ালও আছে—

“একজন বিবাহিত নারী (স্বামী ব্যাতিত) কোন যজ্ঞ কোন ব্রত কোন উপবাস একা পালন করবে না [অর্থাৎ সবকিছুই মিলে করতে হবে]; যদি কোন স্ত্রী তার স্বামীকে মান্য করে, সে (সেই একমাত্র কারণে) স্বর্গলাভ করতে সক্ষম হবে।”

(মনুস্মৃতি, ৫/১৫৫)

পূজা হতে শুরু করে কোন কাজই যে একলা স্ত্রীরই কর্তব্য তেমনটা এক্কেবারেই না। বিবাহের এই বন্ধনটার সব দিক বিবেচনা করে সুপুরুষের যেমন বর্ণনা আছে অনেক জায়গায় তেমনি একজন সুপুরুষের তার স্ত্রী খুঁজারও কিছু নিয়ম আছে,”যে মেয়েটি না মাতৃকূলের সপিণ্ড, বা পিতৃকূললের সগোত্রের, তাকে সুপুরুষের বধূ হিসেবে যোগ্য সুপারিশ করা হয়।

তাকে নিম্নলিখিত সেই দশটি পরিবারের কন্যাদের তার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা উচিৎ নয় – যে তার হতে অনেক মহান, বা অনেক ধনী, যার অনেক তুলনায় বেশি আত্মীয় আছে, ঘোড়া, ভেড়া আদি সম্পদ আছে, যে শাস্ত্রীয় নিয়ম মানে না, যার মধ্যে কোনও পুরুষ সন্তান (জন্ম হয় না), যে বেদে অধ্যয়ন করা হয় না, যার গায়ে ঘন চুল রয়েছে, যে অর্শ্বরোগী।”

(মনুস্মৃতি, ৩/৫-৭)

মনুস্মৃতি আবার নারীর ক্ষেত্রেও বলছে,

“(পিতার উচিৎ) সঠিক বয়স অর্জন না করলেও, একজন বিশিষ্ট, সামর্থ, সমবর্ণের পুরুষের হাতেই কন্যাকে দেওয়া।

তবে যদি কন্যার সঠিক বয়স উপস্থিত হয় তবুও তাকে কোনো নির্গুণ বা ত্যাজ্য সগুণের হাতে তুলে না দিয়ে পিতৃগৃহেই থেকে যাওয়া উচিৎ।

নারী তার যৌবনারম্ভের তিন বছর পর নিজেই স্বামীর খোঁজ করতে পারবে, যদি অভিভাবকদের উদ্যোগে বর না খোঁজা হয়।

এক্ষেত্রে নারীর নিজের বর নির্ধারণে কোনো দোষ নেই।”

(মনুস্মৃতি, ৯/৮৮-৯১)

কিন্তু বিবাহ দুইজনের জন্যই নিয়ম ৮টি প্রথার একটি মেনে করতে হবে। যার ফলে বড়দের অনুমতি তথা বিচক্ষণ চিন্তার প্রভাবও পরবে। এক্ষেত্রে বর্তমানে আমরা ভালোভাবে থাকার যেই class maintain এর কথা বলি সেটা আদিম ঋষিরাও বলত। যাকে স্ববর্ণে বিবাহ বলা হয়। অনুলোম বিবাহ অনেকটা প্রসিদ্ধ হলেও, নারীরা যেহেতু বড়বাড়ি থেকে দরিদ্রের ঘরে গিয়ে থাকতে পারবে না, শাস্ত্র তাই প্রতিলোম বিবাহ বার বার এড়িয়ে চলতে বলছে। এতে মনে হতে পারে যে দরিদ্রকে অবহেলা করা হচ্ছে বা নিম্নবর্ণকে হেয় করছে। কিন্তু আসলে জিনিসটা ওই ভাবে চিন্তা করা হয় নি বরং চিন্তা করা হয়েছে দম্পতির সুবিধার কথা ভালোভাবে থাকার ব্যবস্থা চিন্তা করে। এক্ষেত্রে জোরাজোরি থেকে দুরে থাকার কথাও উল্লেখ্য।

|| একগামী ব্যবস্থা ||

[একজন পতি ও একজন পত্নী ব্যবস্থা]

সাধারণ ভাষায় বলতে গেলে, যেটা সাধারণ তার জন্য নীতির প্রয়োজন পরে না এবং তার চর্চাও (বা তা নিয়ে কথাবার্তাও) কম হয়। একগামীতা একটা সাধারণ জিনিস তা মর্যাদা পুরুষোত্তম রাম-কে দেখলে বা দ্বিতীয় বিবাহের সময় পাণ্ডুর খেদোক্তি দেখেই বুঝা যায়। রামের ঘটনাটা তো সবাই জানি, তিনি কখনো মর্যাদা লঙ্ঘন করেন না। পাণ্ডুর ঘটনাটা ছিলো এমন,

পার্শ্ববর্তী এক রাজ্যে(মদ্রদেশ) যুদ্ধ লাগলে পাণ্ডু হস্তিনাপুরের প্রতিনিধি হয়ে তাদের সাহায্য করতে যায়। এবং সেই দেশের রাজকুমারী এই বচন নিয়ে বসে যে, দেশ শত্রুমুক্ত হলে পাণ্ডুকেই সে বিয়ে করবে। এই জন্য সে কারও থেকে পাণ্ডুর পূর্বে বিবাহ হয়েছে কি না তার খবরও নেয় নি। এক পর্যায়ে শত্রু নাশ হলে মদ্ররাজের কাছে সে আর্জি জানায়। মদ্ররাজ কোন উপায়ান্তর না দেখে কন্যা মাদ্রীকে পাণ্ডর হাতে তুলে দেয়। পাণ্ডু কোনো ভাবেই রাজি না হওয়ার সত্ত্বেও কন্যাকে সঙ্গে পাঠিয়ে দেওয়ায় তার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এবং পরে যখন দেশে ফিরে কুন্তীর কাছে পাণ্ডু বারংবার ক্ষমা প্রার্থনা করে।

এই থেকে সুনিশ্চিত বলা যাচ্ছে, শাস্ত্রমতে একগামীতা একটি সাধারণ বিষয় এবং বহুগামীতা অবাঞ্ছিত।

আরও পড়ুনঃ  শঙ্খ বা শাঁখ কিভাবে রাখবেন? না জানলে বিপদ ||

|| বিবাহবিচ্ছেদ ব্যবস্থা ||

বিয়েতে যখন সপ্তপদী বচন নেওয়া হয়, তখন স্বামী স্ত্রী সাতটি পদক্ষেপ একসাথে নেওয়ার সাথে সাথে বচনবদ্ধ হয়। প্রেম, কর্তব্য, শ্রদ্ধা, বিশ্বস্ততা এবং একটি ফলস্বরূপ মিলনের এই ব্রতগুলি বিনিময় করার, দম্পতি চিরকালের সঙ্গী হতে সম্মত হন এবং প্রার্থনা করেন যে এই সাহচর্যকে ভাঙতে যাতে তাদের কোনও দ্বন্দ্ব না হয়। বলা হয়, “মুখ নির্গত বাক্য আর ধনুক থেকে ছোটা বাণ একবার বের হলে ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।” বিবাহের সময় সপ্তপদী বচনটার জন্য এটি বেশি প্রযোজ্য। তাই ভদ্রলোক কখনো তার বচন ভঙ্গ করেন না। এই ভদ্রলোক হওয়ার জন্যই মূলত বিচ্ছেদ জিনিসটা ঘৃণা করা হয়।

মনুস্মৃতি এই কামনা করছে—

“মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পারস্পরিক বিশ্বস্ততা অব্যাহত থাকুক, এটি স্বামী-স্ত্রীর জন্য সর্বোচ্চ আইনের সংক্ষিপ্তসার হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।

নারী ও পুরুষ, বিবাহে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ক্রমাগত নিজেদের উৎসাহিত করুন, যাতে তারা বিচ্ছিন্ন না হয়ে এবং তাদের পারস্পরিক বিশ্বস্ততা লঙ্ঘন করতে না পারে।”

(মনুস্মৃতি, ৯/১০১)

কিন্তু —

“যদিও (স্বামী) নির্ধারিত আকারে কোনও মেয়েকে গ্রহণ করে, তবে সে দোষী, অসুস্থ বা ঘৃণ্য কাজে অপমানিত বা জালিয়াতি করেছে তবে তাকে ত্যাগ করাই শ্রেয়।”

(মনুস্মৃতি, ৯/৭২)

“তবে একজন অসুস্থ স্ত্রীলোক যিনি (তাঁর স্বামীর প্রতি সদয়) এবং তাঁর আচরণে সদাচারী, তার নিজের সম্মতিতে (কেবলমাত্র) ত্যাজ্য হতে পারেন এবং কখনই তাকে অসম্মানিত করা উচিৎ হবে না।”

(মনুস্মৃতি, ৯/৮২)

নারীদের ক্ষেত্রে বলা যায় —

“যদি কোনো সদাচারী নারী বিয়ের পর আবিষ্কার করে তার বর কলঙ্কিত (হোক তা বিয়ের আগে), কিন্তু সে নিজে সেই পুরুষ ত্যাগ করে অন্যের কাছে না যায় তবে স্বজনদের তার পরামর্শ দেওয়া উচিৎ। যদি তার কোনও সম্পর্ক না থাকে তবে সে তার নিজের মতো অন্য কোনও ব্যক্তির সাথে থাকতে পারে।”

(নারদ স্মৃতি, ১২/৯৬)

এমনকি ঋগ্বেদ ১০/৩৪-এ নারীদের পতিকে ত্যাগ করার দৃশ্য দেখা যায়।


|| পুনর্বিবাহ ব্যবস্থা ||

পুরুষের ব্যাপারে মনুস্মৃতি যা বলছে তা হলো—

“একজন দ্বিজব্যাক্তি (মর্যাদাসম্পন্ন ব্যাক্তি), বিধিমতে বিবাহিত স্ত্রীর মৃত্যুর পর, তাকে পবিত্র অগ্নিতে দাহ করবে। যথা নিয়মে অন্তিম সংস্কার সম্পন্ন করে, সে পুনরায় বিবাহ করতে পারে এবং অগ্নি প্রজ্বলন করতে পারে। এই নিয়মে থেকে সে কখনোই তার পঞ্চযজ্ঞ ত্যাগ করবে না। দ্বিতীয়বারের মতো সে তার স্ত্রীকে নিয়ে নিজের গৃহে বসবাস করবে।”

(মনুস্মৃতি, ৫/১৬৭-১৬৯)

উল্লেখ্য যে, এখানে একগামী ব্যবস্থারই প্রচলিত ইঙ্গিত পাচ্ছে।

নারীর ব্যাপারে মনুস্মৃতি যদিও পুনর্বিবাহের উল্লেখ করে, তাও এটি সুনীতি সম্পন্ন নারীদের করতে নিষেধ করে। অন্যদিকে পরাশর সংহিতা বলছে— “পতির প্রয়াণে, সন্যাস গ্রহণে, নিরুদ্দেশাবস্থায়, অক্ষম অধার্মিক বা অত্যাচারী হলে নারী স্বেচ্ছায় বিচ্ছেদ করে পুনরায় বিবাহ করতে পারবে।”

(পরাশর সংহিতা, ৪/২৬)

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়কে এই জন্য বিশেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করি, যিনি বিধবা বিবাহ আইন পাস করে অকাল বৈধব্যের বোঝা থেকে অনেক নারীকে মূক্ত করেছেন। উল্লেখ্য যে, বেদ দেবর কে দ্বিতীয় বর হিসাবে উল্লেখ করে। স্বামীর মৃত্যুর পর দেবর স্বামীর সকল দায়িত্ব পালন করার কথা যেমন দেখা যায়, তেমনি ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে বিধবার সহিত দেবরের সহবাসের কথাও উল্লেখ করে।

এখানে মনুস্মৃতিও বলছে—

“যদি কোনো স্ত্রীর স্বামী (দুর্ঘটনায় বা অকালে) মারা যায়, তবে তার দেবর যথা বিধিতে তাকে বিবাহ করতে পারবে।”

(মনুস্মৃতি, ৯/৬৯)

“যে নারী তার স্বামীকে ত্যাগ করে, উচ্চবর্ণের তথা বিত্তশালীর সাথে সহবাস করে, তাকে তুচ্ছ বলে গণ্য করা হবে।”

(মনুস্মৃতি, ৫/১৬৩)

অতএব দুই রাস্তাই খোলা আছে। নিজের ইচ্ছা এবং বিজ্ঞের মতামত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাটাই শ্রেয়।

|| বহুগামী ব্যবস্থা ||

[এক স্বামী বহুস্ত্রী ব্যবস্থা]

উদাহরণ — কৃষ্ণ (১৬,১০৮ পত্নী), চন্দ্রদেব (২৭ পত্নী) ইত্যাদি।

“প্রথম বিবাহের ক্ষেত্রে, একজন দ্বিজের ক্ষেত্রে সমবর্ণের কন্যার পরামর্শ দেওয়া হলো, কিন্তু যদি সে পুনরায় বিবাহ করতে চায় তবে তার নিয়মানুসারে সর্বাধিক অনুমোদিত পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিৎ।

শূদ্র স্ত্রী কেবল শূদ্র পুরুষকেই বিবাহ করতে পারবে, অন্য বর্ণে প্রথমে সমবর্ণের পরে অন্য বর্ণের হিসাবে বিবেচনা করে বৈশ্যের দুই, ক্ষত্রিয়ের তিন, ব্রাহ্মণের চার বার বিবাহ প্রশস্ত।”

আরও পড়ুনঃ  দেবী দুর্গা গজ, ঘোটক, নৌকা ও দোলায় যাতায়াত করেন কেন?

(মনুস্মৃতি, ৩/১২-১৩)

বলা বাহুল্য, পিতামাতার সম্মতি এবং তাদের যোগদানে প্রথম বিবাহ হলেও দ্বিতীয় বিবাহে তাদের কোনো হাত থাকে না। কারণ কোনো সংস্কার দ্বিতীয় বার করার ব্যবস্থা নেই। এতে বুঝা যায়, দ্বিতীয় বিবাহ পুরুষের জন্যও অতোটা অনুমোদিত না। অন্তত সমাজের দিক থেকে হলেও।

এদিক থেকে বেদ প্রমাণ দিয়ে দিয়েছে, “শাস্ত্রগুলো আমাদের পথ দেখায়। চলার কাজটা সম্পূর্ণ আমাদের।”

*ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১৫৯তম সুক্তে দেখা যায়, বহুবিবাহের উপস্থিতি যার প্রভাব রীতিমতো কৌতুককর ও ভয়াবহ। কিন্তু বহুবিবাহ প্রশস্ত হলেও তার কুফল যে কী পরিমাণ লেখা আছে তা দেখলে একজন সুস্থ মস্তিষ্কের পুরুষ কখনো একাধিক বিয়ে করার সাহসও করবে না। উক্ত সুক্তের তৃতীয় শ্লোকে দেখা যায়, কেবল নিজেকে ‘স্বামীর কাছে আদরণীয়’ করে তুলেই স্ত্রী ক্ষান্ত হয় নি, স্বগর্ভজাত কন্যাকে

সতীন-কন্যা অপেক্ষা স্বামীর নিকট আদরণীয় করে তুলতে তার প্রচেষ্টার অন্ত ছিল না ‘আমার কন্যাই সর্বশ্রেষ্ঠ শােভায় শােভিত'(১০/১৫৯/৩)। এক বনে যেমন দুটি সিংহ থাকে না, এক স্বামীর তেমনি দুই স্ত্রী থাকবে না। সপত্নী পীড়নে জর্জরিত নারীর সগর্ব ও হিংস্র ঘােষণাপত্র লক্ষ্য করুন ‘আমার শত্রু জীবিত রাখি না, শত্রুদের আমি বধ করি, জয় করি, পরাস্ত করি।…আমি সকল সপত্নীকে জয় করেছি, পরাস্ত করেছি’ ( ১০/১৫৯/৫-৬)। সতীনদের পরাছ করার ফল-স্বরূপ ‘আমি এ বীরের ( স্বামীর) উপর প্রভুত্ব করি; পরিবারবর্গের উপরও প্রভুত্ব করি’ (১০/১৫৯/৬)। সে যুগে সপত্নীদের কত নির্মমভাবে পীড়ন করা হত তার পূর্ণ চিত্র পাওয়ার জন্যে আমি দশম মণ্ডলের একশাে পঁয়তাল্লিশ সুক্তের আরো কিছু, ঋকের অনবাদ এখানে উদ্ধৃত করছি, ‘এই যে তীব্র শক্তিযুক্ত লতা, এ ওষধি, এ আমি খননপূর্বক উদ্ধৃত করছি, এ দিয়ে সপত্নীকে ক্লেশ দেওয়া যায়, এ দ্বারা স্বামীর প্রণয়লাভ করা যায়’ ‘হে ওষধি! … তােমার তেজ অতি তীব্র, তুমি আমার সপতীকে দূর করে দাও’; ‘হে ঔষধি ! তুমি প্রধান, আমি যেন প্রধান হই, প্রধনের উপর প্রধান হই, আমার সপত্নী যেন নীচেরও নীচ হয়ে থাকে।’ সপত্নী পীড়নের পর স্বামীকে বশ করার জন্য তুকতাকের সঙ্গে বশীকরণ মন্ত্রও উচ্চারিত হতে দেখেছি, ‘হে পতি এ ক্ষমতাযুক্ত ওষধি তােমার শিরোভাগে রাখলাম। সে শক্তিযুক্ত উপাধান (বালিশ ) তোমার মস্তকে দিতে দিলাম। যেমন গাভী বৎসের প্রতি ধাবিত হয়, যেমন জল নিম্নপথে ধাবিত হয়, তেমনি যেন তােমার মন আমার দিকে ধাবিত হয়’ (১০/১৪৫/৬)। বুঝতে কোনই কষ্ট হয় না স্ত্রীজাতি স্বামীকে যমের হাতে তুলে দিতে পারে। কিন্তু সতীনের হাতে নয়।*

বোঝাই যাচ্ছে বহুগামী ব্যবস্থাটা খুব ভালো দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে না।

|| বহুভর্তৃকত্ব ব্যবস্থা ||

[এক স্ত্রী বহুস্বামী ব্যবস্থা]

কিছু আদিবাসী গোষ্ঠীতে ছাড়া এই ব্যবস্থা এক্কেবারেই অপ্রচলিত এবং ঘৃণ্য ধরা হয়। এই ব্যবস্থার উপস্থিতি দেখা গেলেও বেদেও (ঋগ্বেদ, ১০/৩৪/৫) বিজ্ঞ সমাজ এসব নারীদের ভ্রষ্টা বলে সম্বোধন করেছেন। এদিকে মহাভারতে, যেখানে মূল চরিত্রই এই ব্যবস্থা অনুসরণ করেছে সেখানেও বলছে—

“এখানে কোনো পাপ নেই। একজন পুরুষের জন্য বহুগামিতা যোগ্যতার কাজ, কিন্তু একজন নারীর জন্য প্রথম স্বামীর পর দ্বিতীয় স্বামী নেওয়া দোষের।”

(মহাভারত, ১/১৬০/৩৬)

কিন্তু দ্রৌপদী কেন এই ব্যবস্থা গ্রহণ করল? কেনই বা তাকে কিছু বলা হলো না?

এখানে অনেক ঘটনার কথা টানতে হবে। যেমন দ্রৌপদীর পূর্ব জন্ম যেখানে ৫ গুণসম্পন্ন বর চেয়েছিল সে মহাদেবের কাছে। তারপর আবার কুন্তীর বেখেয়ালি আচরণ, যদিও সে পূজায় ব্যস্ত থাকায় তাতেও তার দোষ নেই। পাঁচ পাণ্ডবের মাতৃ আজ্ঞা যা তারা ভঙ্গ করতে পারবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। সব মিলিয়ে এক সংকট উৎপন্ন হয়। এদিকে আবার দেশ রক্ষার সামনে বিবাহ জিনিসটা অনেক সামান্য। এবং তার ফল স্বরূপ সংকট ধর্মের আশ্রয় নিতে হয়।

[বি.দে. — আগেই বলে রাখি, সংকট ধর্মের বিষয়টা অনেক জটিল। এটির আশ্রয় কেবল সংকটকালেই নেওয়া যায়। এতে অনেক সময় এমন অনেক কিছু করা শাস্ত্র সঙ্গত যা সাধারণ অবস্থায় মোটেও উচিৎ নয়]

মহোর্ষী বেদব্যাস এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অনুমতিক্রমে শেষ পর্যন্ত এই সমাধান দেওয়া হয় যে, সেই মূহুর্তে সেই কাজটি যুক্তিযুক্ত হলেও তা কখনোই কাম্য নয়। এটি নারীর জীবনে কলঙ্কের সমান। এবং এই ব্যবস্থায় গিয়েও দ্রৌপদীকে এই আশির্বাদ করা হয় যে, সে অন্যদের এতো ভেজালের মধ্যে পরে কলঙ্কিত থাকবে না। ব্যাসদেবের কথা মতো, এক বৎসরের জন্য কেবলমাত্র একজনের স্ত্রী হিসেবে থাকবে। পাঁচ জন কে বিয়ে করেও সে কখনো একই সময়ে একাধিক ব্যাক্তির স্ত্রী হিসাবে যেমন থাকবেও না তেমন একাধিক ব্যাক্তির স্ত্রী হিসাবে পরিচিতও হবে না। যার ফলে, মানুষের যাবতীয় সমস্যাগুলো কখনো তাকে স্পর্শ করে নি। এটা সংকট ধর্মের অনন্য এক উদাহরণ যা মানুষকে বিরূপ অবস্থায় কাজ করতে শিখায়। এটা কোনো আশকারা দেওয়ার জিনিস নয়।

|| সমকামী ব্যবস্থা ||

দুক্ষের সঙ্গে জানানো যাচ্ছে যে আমি এই বিষয়ের জন্য কোনো সহায়তা করতে পারছি না। অনেকেই আমাকে বিভিন্ন উদাহরণ তুলে দেবে, যেমন — অয়্যপ্পা, মনুর কন্যা ইলা ইত্যাদি ইত্যাদি।

  • তাদের বলছি,অয়্যপ্পার জন্মের সময় ভগবান বিষ্ণু তার মোহিনী অবতারে ছিলেন। মোহিনী অবতারে ভগবান বিষ্ণু নারীর দেহে অবস্থান করছিলেন। আবার তিনি তার বিষ্ণু রূপে ছিলেন না। মহাদেব কোনো পুরুষের সাথে মিলনে লিপ্ত হন নি। দেবী মোহিনী (ভগবান বিষ্ণু) নারী দেহেই অয়্যপ্পাকে গর্ভধারণ করেছিলেন। তাই হরি হর পুত্র বললেও এটা সমকামীতার উদাহরণ নয়।
  • মনু কন্যা ইলা অভিশপ্ত হয়ে একমাস নারী একমাস পুরুষ হিসাবে থাকতো। তার মানে এই না যে পুরুষ রূপে ইলার সাথে একজন পুরুষের বিবাহ হয়েছে। আর এটা জানা উচিৎ যে, শাস্ত্র আট-আটটি বিবাহ প্রথার পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু তার একটিও পুরুষের সঙ্গে পুরুষের বা নারীর সঙ্গে নারীর বিবাহের পরামর্শ দেয় না।

অপর দিকে, সুশ্রুত সংহিতা মতে পুরুষ সমকামীর উপস্থিতি থাকলেও, নীতিশাস্ত্র মনুস্মৃতি বলছে —

আরও পড়ুনঃ  শাস্ত্রমতে যে নারীকে বিবাহ করা যাবে না।

“ব্রাহ্মণকে আহত করা, যেই জিনিসের ঘ্রাণ গ্রহণ করা উচিৎ নয় এমন জিনিসের ঘ্রাণ নেওয়া, অতিমাত্রায় কোহল (alcohol) মিশ্রিত মদ্য পান, প্রতারণা, পুরুষের সঙ্গে যৌনমিলন জাতিভ্রংশের কারণ।”

(মনুস্মৃতি, ১১/৬৭)

অপস্তম্ভ ধর্মসূত্র এই কাজকে আরো বড় অপরাধ বলে দেখছে —

“যোনি ব্যতীত অন্য যে কোনও জায়গায় তার বীর্যপাত হয়ে যায় এমন একজন লোক চোরের সমান হয়ে যায়, একজন ব্রাহ্মণের খুনির সমান হয়।”

(অপস্তম্ভ ধর্মসূত্র, ১/১৯/১৫)

আর বৌধায়ণ শাস্ত্রও একই কথা বলছে। এই অপরাদের শাস্তিটা অবশ্য কমই দেওয়া আছে—

“একজন দ্বিজ যে পুরুষের সাথে অপ্রাকৃত আচরণ (মিলনে) লিপ্ত হয়, বা গরুর গাড়িতে বা পানিতে বা দিবা ভাগে মিলনে লিপ্ত হয় তবে তাকে সবস্ত্রে অবগাহন স্নান করতে হবে।”

(মনুস্মৃতি, ১১/১৭৪)

নারী সমকামীদের ব্যপারেও একই ভাবে বলা আছে —

“যেই নারী অন্য নারীকে দূষিত (এক নারী অন্য নারীকে মিলনে লিপ্ত) করে তাকে জরিমানা হিসাবে তার বিবাহ খরছের দ্বিগুণ টাকা দিতে হবে সমেত দু’শ পানা দিতে হবে এবং তাকে দশবার বেত্রাঘাত করা হবে…”

(মনুস্মৃতি, ৮/৩৬৯-৩৭০)

এখানে নারীর শাস্তিটা বেশি কারণ নারীর দেহ পবিত্র এবং সন্তান ধারণকারী দেবী হিসাবে গণ্য করা হয়। তাই তাকে অপবিত্র করার পাপ স্বরূপ এটা করা হয়েছে। আর এই অপরাধের শাস্তির পুরোটা লিখা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এতো কঠোর শাস্তির কথা লিখতে পারলাম না। দুঃখিত।

আর স্পষ্ট ভাষায় নারী পুরুষ হওয়ার কারণও বর্ণিত আছে—

“মা হওয়ার জন্যই নারী জাতি এবং পিতা হওয়ার জন্য পুরুষ জাতির সৃষ্টি করা হয়েছে। অতএব নারী পুরুষ মিলে বৈদিক ক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করুন।”

(মনুস্মৃতি, ৯/৯৬)

সত্যি বলিতে, মূল শাস্ত্রগুলো নারী পুরুষের মধ্যে এই এক স্থানে ছাড়া আর কোথাও তেমন একটা পার্থক্য করে না। সব নীতি সব নিয়ম দুজনের জন্যই সমান।

অতএব, সমকামী ব্যবস্থা শাস্ত্রীয় নয় বলতে হচ্ছে।

|| মূল উত্তর ||

বিবাহ বিচ্ছেদ ব্যবস্থা অবশ্যই আছে। নেই বললে ভুল হবে। নির্ধারিত কিছু যুক্তি ও শর্ত পূরণেই বিবাহ বিচ্ছেদ সম্ভব হলেও তা কখনোই কাম্য নয়। এবং তার সর্বদা সবাই অপ্রশংসিত বলে গণ্য করে আসছে।

বহু বিবাহের ক্ষেত্রে পুরুষকে অধিকার দিলেও তা তেমন একটা গ্রহণ যোগ্য নয়। নারীর ক্ষেত্রে পুত্রের জন্ম পরিচয় দেওয়ার কষ্ট হবে বলে, মূলত পিতা নির্ধারণ করা কষ্টকর হবে বলে তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মূল কারণ অবশ্য এখানকার পরিবার ব্যবস্থা, যা একজন ব্যাক্তিকে তার আদিম পুরুষের কথা জানিয়ে দেয়। এই সুগঠিত গোত্র ব্যবস্থা আমাদের অনেক জাতি থেকে উন্নত করে রেখেছে। যার ক্ষতি রোধ করা দরকার। সত্যি বলতে, যদি নারী তান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা হতো তবে হয়তো নারীদের জন্য বহু বিবাহ প্রচলিত হতে পারতো। তখন আবার পুরুষের জন্য নারীদের নিয়মটা দেওয়া হতো। এখন এটাতে তো আর কিছু করার নেই।

অতএব সমাধান একটাই, বহুবিবাহই অশাস্ত্রীয় ঘোষণা দেওয়া। কিন্তু মৃত্যুর পর পুনর্বিবাহতে কোনো সমস্যা নেই।

[বি.দ্র. — মানুষ সর্বদাই নিয়ম ভেঙ্গে আসছে। এখন অনেক কিছুই অশাস্ত্রীয় কাজ করব থাকে। তাই অনেক সাধারণ নিয়মের উল্টোও দেখা যেতে পারে। আমি কারও মন ভুলানোর জন্য বানিয়ে গল্প লিখতে পারবো না। তাই মনে না ধরলে আমি ক্ষমা প্রার্থী। আমার কিছু করার ছিলো না]

|| উপরিলাভ ||

এতোকিছু পড়তে পড়তে আজকে হঠাৎ নতুন এক জিনিস আবিষ্কার করলাম। বিজ্ঞান বইয়ে নবম দশম শ্রেণীতে আমরা শুক্রাণু ডিম্বানুর কথা পড়েছিলাম, যেখানে বর্তমান বিজ্ঞানের আবিষ্কার বলছে এটি সম্পূর্ণ শুক্রাণুর ধরণের উপর নির্ভর করে সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে, যা তে পিতা মাতার কোনো হাত(নিয়ন্ত্রণ) নেই। সাধারণত, এদেশে নারীদেরই পুত্র সন্তান জন্ম দিতে না পারার জন্য দোষ দেওয়া হয় এবং এটি অত্যন্ত দুঃখজনক । আর আমরা আমাদের প্রাচীণ সমৃদ্ধ এবং বিজ্ঞান সম্মত শাস্ত্র সম্বন্ধে কতোটা অজ্ঞ হলে এগুলো বলি দেখুন—

“একটি পুংসন্তান জন্মায় সগুণ পুং শুক্র হতে [বা পুং শুক্র বেশি থাকলে পুংসন্তান জন্মানোর সম্ভাবনা থাকে], স্ত্রী-সন্তান স্ত্রী শুক্র হতে। যদি (উভয়) সমান হয় তবে উভলিঙ্গ বা একজন পুত্র এবং একজন কন্যা হয়; যদি দুর্বল বা কম গুণসম্পন্ন হয় তবে সন্তান ধারণে অক্ষম হয়।”

(মনুস্মৃতি, ৩/৪৯)

স্পষ্ট যে নারীর ডিম্বাণু নয় শুক্রাণুর উপরই নির্ভর করে সন্তানের লিঙ্গ।

বর্তমান বিজ্ঞান এগুলো কিছু বছর আগে আবিষ্কার করেছে যা শাস্ত্রে অনেক আগেই বলা আছে। হয়তো আমারা আগে এগুলো পড়লে এতো নারী এভাবে পুত্র সন্তানের আশায় অত্যাচারীত হতো না, বিষণ্ণতায় থাকতো না। হয়তো অনেকে প্রাণে বেঁচে যেতো।

মূল লেখাঃ পল্লব সেন

হিন্দু বা সনাতন ধর্মীয় সকল প্রকার তথ্য, আচার-নিয়ম, সংস্কৃতি, আখ্যান ও উপাখ্যান জানতে আমাদেরকে ইউটিউবে বা ফেসবুকে ফলো করতে পারেন।

5/5 - (1 vote)

Leave a Reply