You are currently viewing মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রের পিছনের পৌরাণিক কাহিনী || যম থেকে মার্কণ্ডেয়কে বাঁচালেন মহাদেব ||

মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রের পিছনের পৌরাণিক কাহিনী || যম থেকে মার্কণ্ডেয়কে বাঁচালেন মহাদেব ||

Aum Tryambakam yajaamahe sugandhim pushtivardhanam |

Urvaarukamiva bandhanaan-mrityormuksheeya maamritaat ||

 

ॐ त्र्य॑म्बकं यजामहे सु॒गन्धिं॑ पुष्टि॒वर्ध॑नम्।

उ॒र्वा॒रु॒कमि॑व॒ बन्ध॑नान् मृ॒त्योर्मु॑क्षीय॒ माऽमृता॑॑त्।।

 

ওঁ ত্র্যম্বকম্ যজামহে সুগন্ধিম্ পুষ্টিবর্ধনম্।

উর্বারুকমিব বন্ধনান্ মৃত্যোর্মুক্ষীয় মাঽমৃতাৎ।।

আজ্ঞে হ্যাঁ এটাই সেই মহা শক্তিশালী মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র। যার অর্থ হচ্ছে, যার তিনটি নেত্র রয়েছে, যিনি জগতের লালন পালন করেন। তার কাছে প্রার্থনা করি যে তিনি যেন আমাদের মৃত‍্যুর বন্ধন থেকে মুক্ত করে দেন। ঠিক যেমন একটি শশা পরিপক্ব হয়ে তার শাখা প্রশাখার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যায় তেমনি আমরা যখন জ্ঞানের আলোকে পরিপক্ব হয়ে উঠব তখন যেন আমরা মুক্তি লাভ থেকে বঞ্চিত না হই। আপনি জেনে অবাক হবেন এই মন্ত্রটির আবির্ভাবের পিছনে রয়েছে এক আশ্চর্য পৌরাণিক কাহিনী এবং অভূতপূর্ব একটি ঘটনা। কিন্তু আসলেই কি এই মন্ত্র পাঠ করলে মৃত্যু থেকে রেহাই পাওয়া যাবে ? আসলেই কি এর সর্বরোগ হরণের ক্ষমতা রয়েছে? এই মন্ত্র পাঠ করলে কি কি ধরণের ফল পাওয়া যায়? আবার এই মন্ত্র পাঠ করার সময় কি কি ধরণের সাবধানতা অবলম্বন না করলে হিতে বিপরীত হতে পারে? এসকল প্রশ্নের উত্তর এবং একটি অসাধারন পৌরাণিক কাহিনীর সমন্বয়ে পরিবেশিত হল আমাদের আজকের আয়োজন। আশা করি ভিডিওটির শেষ অবধি আমাদের সাথেই থাকবেন এবং পরিবেশনাটি তথ্যপূর্ণ মনে হলে কমেন্ট বক্সে হর হর মহাদেব লিখতে ভুলবেন না।

মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র একটি সর্বরোগ হরণকারী মন্ত্র। দেবাদিদেব মহাদেবের প্রতি উৎসর্গকৃত এই মন্ত্রটি মূলত দৃষ্ট হয় ঋগ্বেদে এবং মার্কণ্ডেয় পুরাণে। সনাতন বিশ্বাসে এই মন্ত্রটি জপ করলে সাংসারিক অশান্তি ও রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তি লাভ করার পাশাপাশি মৃত্যুকেও জয় করা যায়। তাছাড়া শিবকে প্রসন্ন করার জন্য মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করা সবচেয়ে ভালো উপায়। আপনারা অনেকেই জানেন এই মন্ত্রর রচয়িতা হচ্ছেন ঋষি মার্কণ্ডেয় যিনি নিজে এই মন্ত্র জপ করে অকাল মৃত্যু থেকে রেহাই পেয়েছিলেন। আবার কোন মতে যেহেতু এই মন্ত্রটি ঋগবেদে লিপিবদ্ধ রয়েছে সেহেতু এর রচয়িতা হচ্ছেন মহর্ষি বশিষ্ঠ। তো প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক কি কি কারনে এই মন্ত্রটি জপ করা হয়। নিজের বা পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য দুর্বল হলে, কোন কাজে লাগাতার বাধা এলে, নতুন গৃহ নির্মাণ করালে, কোন ব্যাক্তির কোষ্ঠিতে কোন গ্রহ দোষ থাকলে, নানান ধরনের ভয় সমাপ্ত করার জন্য এবং সর্বোপরী মৃত্যু, অকাল মৃত্যু, শোক ও মৃত্যুতুল্য যে কোন সংকট থেকে উত্তোরণের জন্য এই মহামৃত্যুঞ্জয় মহামন্ত্র জপের বিধান।

আরও পড়ুনঃ  গনেশের মুখ হাতির মত কেন? || গনেশের জন্ম রহস্য || Origin of Ganesh ||

এবার আসি এই মন্ত্র জপের সময় সাবধানতা অবলম্বনের বিষয়টিতে। আপনারা সকলেই জানেন সনাতন ধর্মের সবচেয়ে শক্তিশালী মন্ত্রগুলোর মধ্যে এই মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র অন্যতম। কিন্তু জেনে রাখা ভালো, এই মন্ত্রটি জপের সময় কিছু সাবধানতা অবলম্বন না করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই কিছু বিষয়ে সাবধান হওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন শাস্ত্রজ্ঞরা।

  • প্রথমত, মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রের শব্দের গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই এই মন্ত্র জপ করার সময় এর উচ্চারণের শুদ্ধতা বাঞ্ছনীয়।
  • দ্বিতীয়ত, এই মন্ত্রটি অবশ্যই মালার সাহায্যে জপ করতে হবে। কারণ সংখ্যাহীন জপের ফল পাওয়া যায় না। তাই প্রতিদিন অন্ততপক্ষে একমালা জপ পূর্ণ করা উচিত।
  • আগে কখনো এই মহামন্ত্র জপ করে থাকলে তাঁর তুলনায় কম জপ করা যাবে না। তবে তার চেয়ে যত ইচ্ছা বেশি বার জপ করা যেতে পারে।
  • মনে রাখতে হবে এই মন্ত্র উচ্চারণের সময় স্বর ঠোঁটের বাইরে আসা উচিত নয়।
  • কম স্বরে, ধীরে ধীরে এবং রুদ্রাক্ষের মালায় এই মন্ত্র জপ করার বিধান। মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপের আগে শিবের সামনে ধূপকাঠি ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করতে হবে।
  • এরপর কুশের আসনে বসে নিজের মুখ পূর্ব দিকে রাখার বিধান। লক্ষ্য রাখতে হবে জপের সময় যাতে প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত থাকে।
  • তাছাড়া জপের সময় শিবলিঙ্গের পাশে বসে জপ করে থাকলে জল বা দুধ দিয়ে শিবলিঙ্গের অভিষেক করতে হবে।
  • এবং জপের দিন ব্রহ্মচর্য পালন করে, শান্ত স্থানে এবং একাগ্র মনে ঈশ্বরে মনোনিবেশ করা বাঞ্ছনীয়।
  • মনে রাখতে হবে, জপ করার সময় হাই তোলা, আলস্য করা বা জপের মাঝখানে কারও সঙ্গে কথা বলা থেকে থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।

যাইহোক এবার আসি সেই পৌরাণিক কাহিনীতে।

একদা ভৃগু বংশে মৃকাণ্ডু নামক এক মুনি ছিলেন। দেবাদিদেবের পরম ভক্ত এই মৃকাণ্ডু মুনি ছিলেন পুত্রসুখ বঞ্চিত। তাই তেজস্বী ও বিদ্বান পুত্রলাভের আশায় ভগবান শিবের নিত্য আরাধনা করতেন তিনি। ধর্মপরায়ণ ও জিতেন্দ্রিয় এই মুনির পিতা ডাক শোনার আকুতি নাড়া দিয়েছিল দেবাদিদেব মহাদেবকে। তাই মুনির তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে একদা ভগবান শিব প্রকট হলেন মৃকাণ্ডু মুনির সামনে।  বললেন- “হে মৃকাণ্ডু মুনি, তোমাকে দুইটি বর থেকে যেকোন একটি বর বেছে নিতে হবে।” ১ম বর হচ্ছে তুমি এক ধার্মিক, বুদ্ধিমান ও বিদ্বান পুত্রের জনক হবে যার আয়ুস্কাল হবে অতি সামান্য। এবং ২য় বরটি হচ্ছে, তুমি এক মূর্খ ও নির্বোধ সন্তানের জনক হবে যার আয়ুস্কাল হবে দীর্ঘ। এই দুটি বর থেকে যেকোন একটিকে বেছে নিতে হবে মৃকাণ্ডু মুনিকে। কিন্তু সেটা মোটেও সহজ কাজ নয়। তাই অনেক ভেবে মৃকাণ্ডু মুনি স্বল্পায়ু এবং বুদ্ধিমান পুত্রটিকেই বর হিসেবে চাইলেন। দেবাদিদেব মহাদেব সেই পুত্রের বয়স নির্ধারন করলেন মাত্র ১৬ বছর এবং মুনিকে পুত্রলাভের বরদান দিয়ে অদৃশ্য হলেন।

আরও পড়ুনঃ  সহজভাবে ও শুদ্ধভাবে গীতা পাঠ করার নিয়ম / উপায় || গীতার ১৮ টি নাম মাহাত্ম্য || গীতাপাঠের ফল।

এর কিছুদিন পর শিবের কৃপায় মৃকাণ্ডু মুনির স্ত্রী মারুদমতি একটি পুত্র সন্তান জন্ম দিলেন যার নাম রাখা হল মার্কণ্ডেয়। ছোটবেলা থেকেই মার্কণ্ডেয় ছিলেন ভোলানাথ শিবের পরম ভক্ত। তাছাড়া তিনি ছিলেন মেধাবী, বুদ্ধিমান ও পরিশ্রমী। অতি অল্প বয়সেই তিনি  বেদাদি শাস্ত্রে সুপণ্ডিত হয়ে আত্মপ্রকাশ করলেন সকলের সামনে। তাঁর অসামান্য জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য দেখে ধন্য ধন্য করতেন আশেপাশের সবাই। এভাবেই চলতে লাগল কিছুকাল। কিন্তু এমন সুপুত্রের পিতামাতা হয়েও মৃকাণ্ডু মুনি ও মারুদমতী ছিলেন চরম হতাশাগ্রস্থ। ছেলের অনিষ্ট আশংকায় সর্বদাই বিচলিত থাকতেন এই দম্পতি। ক্রমে ক্রমে পিতামাতার এই মলিন মুখমণ্ডল দৃষ্টিগোচর হল মার্কণ্ডেয় মুনির। এবং ঘটনার পরম্পরায় তিনি তাঁর পিতামাতার কাছ থেকে জানতে পারলেন তাঁর জন্ম বৃত্তান্ত এবং তাঁর জীবনের সময়সীমা। অবশেষে তিনি তাঁর মাতাপিতা কে সান্তনা দিয়ে শুরু করলেন শিবে কঠোর আরাধনা। শিবের আরাধনা করতে করতে তিনি এক আশ্চর্য মন্ত্র দর্শন করলেন। আর সেই মন্ত্রটিই হচ্ছে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র। এরপর তিনি সেই মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপে চললেন অবিরাম।

কালক্রমে ১৬ বছর বয়স পূর্ণ হল মার্কণ্ডেয় মুনির। কিন্তু জীবনের শেষ দিনটিতেও তিনি মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র উচ্চারণ করে মহাদেবের সাধনা করে চলেছেন অবিরাম। আর তাঁর সামনে থাকা শিবলিঙ্গটি প্রতিনিয়তই অভিষিক্ত হচ্ছে তাঁর চোখের জলে। এদিকে মার্কণ্ডেয় মুনির প্রাণ হরণ করতে হাজির হলেন যমদূত। কিন্তু দেবাদিদেবের এমন কঠোর সাধনারত মার্কণ্ডের মুনির প্রাণ হরণ করতে কিছুটা ভীত হলেন তিনি। এরপর যমালয়ে ফিরে গিয়ে স্বয়ং যমরাজকে অনুরোধ করলেন মার্কণ্ডেয় মুনির প্রাণ হরণ করার জন্য। যমদূতের কথা শুনে স্বয়ং যমরাজ এলেন ঋষি মার্কণ্ডেয়র কাছে। তিনি দেখলেন দেবাদিদেবের পরম ভক্ত মার্কণ্ডেয় শিবলিঙ্গকে জড়িয়ে ধরে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করছেন এবং অঝোরে কাঁদছেন। কিন্তু বিধির বিধান পালন হেতু যমরাজের কাছে তাঁর প্রাণ হরণ করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। তাই তিনি তাঁর হাতের ফাঁসটি ছুড়ে দিলেন মার্কণ্ডেয় মুনির দিকে। কিন্তু ফাঁসটি লক্ষ্যচ্যুত হয়ে গিয়ে পড়ল শিবলিঙ্গের উপর। চমকে উঠলেন যমরাজ, এবার কি হবে। শিবকে প্রতিরোধ করা কিভাবে সম্ভব?

আরও পড়ুনঃ  ইতু পূজা কি? কেন করা হয়? ইতুপূজার ব্রতকথা || ইতুব্রতের ইতিহাস ||

যমরাজের সেই ভাবনায় ছেদ টেনে সগর্জনে শিবলিঙ্গের মধ্য থেকে প্রকট হলেন স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেব। এরপর তিনি উদ্যত হলেন যমরাজকে দণ্ড প্রদান করার জন্য। শিবের ক্রোধ সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই অবগত ছিলেন যমরাজ। তাই বিনা বাক্য ব্যায়ে তিনি লুটিয়ে পড়লেন মহাদেবের চরণে। বললেন, ‘হে প্রভু, আমি যে আপনারই সেবক, আপনার আদেশেই প্রাণীর প্রাণ হরণের মত নিষ্ঠুর কাজ আমি করে যাচ্ছি। আমি যে নিরুপায়, দয়া করে আমাকে পথ প্রদর্শন করুন। ’ যমরাজের সমর্পণ দেখে শান্ত হলেন শিব। তিনি যমরাজকে মার্কণ্ডেয় মুনির পাণ হরণ করা থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিলেন। এবং মার্কণ্ডেয়কে দীর্ঘজিবী হওয়ার বা মতান্তরে ইচ্ছামৃত্যুর বরদান করলেন। এদিকে যমরাজ তাঁর ভুল বুঝতে পেরে দেবাদিদেবকে বললেন, ‘হে প্রভু, আপনার আজ্ঞা সর্বোপরি। আমি আপনার ভক্ত মার্কণ্ডেয় রচিত মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র যে পাঠ করবে, তাঁকে কষ্ট দেব না এবং মৃত্যুভয় তাঁকে স্পর্শ করতে পারবে না।’ এই বলে শিব এবং যমরাজ একে একে প্রস্থান করলেন। আপনারা অনেকেই জানেন ঋষি মার্কণ্ডেয়র এই অমরত্ব প্রাপ্তি বা দীর্ঘজীবি হওয়ার বর প্রাপ্তির জন্য তাঁকে অষ্ট চীরঞ্জিবীর একজন বলে আখ্যায়িত করা হয়।

 

5/5 - (3 votes)

Leave a Reply