You are currently viewing পূর্বজন্মে  পরম বিষ্ণুভক্ত হয়েও কেন পরজন্মে রাবণ ও কুম্ভকর্ণ রূপে জন্মাতে হল?

পূর্বজন্মে পরম বিষ্ণুভক্ত হয়েও কেন পরজন্মে রাবণ ও কুম্ভকর্ণ রূপে জন্মাতে হল?

জানেন কি রাবণ ও তাঁর ভ্রাতা কুম্ভকর্ণ পূর্বজন্মে পরম বিষ্ণুভক্ত ছিলেন? আজ্ঞে হ্যাঁ, ত্রেতাযুগে ভগবান বিষ্ণুর অবতার শ্রীরামচন্দ্র মহাসংগ্রাম করে যে রাবণ ও কুম্ভকর্ণকে বধ করেছিলেন তাঁরাই পূর্বজন্মে ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর পরম ভক্ত। কিন্তু ভগবান বিষ্ণুর পরম ভক্ত হওয়ার স্বত্বেও কেন তাঁরা মর্ত্যধামে প্রবল বিষ্ণু-বিদ্বেষী হয়ে উঠেছিলেন? আর কেনইবা তাদেরকে বধ করতে স্বয়ং ভগবানকে অবতার ধারণ করতে হয়েছিল? ভাগবত পুরাণে বর্ণিত অসাধারন এই পৌরাণিক কাহিনীটি আপনাদের সম্মুখে উপস্থাপন করতেই আমাদের আজকের আয়োজন।

আপনারা অনেকেই চতুষ্কুমার বা চার কুমারের নাম শুনে থাকবেন। সৃষ্টির প্রারম্ভে ব্রহ্মা যখন তাঁর সৃষ্টিকার্য রচনা করার জন্য সংকল্প করেন, তখন তাঁর মন থেকে চারজন শিশুকুমার উৎপন্ন হয়। এই চারজন শিশু কুমারকে ব্রহ্মা সৃষ্টি বৃদ্ধি করতে নির্দেশ দেন। অর্থাৎ ব্রহ্মা চেয়েছিলেন তাঁদের মাধ্যমেই মর্ত্যলোকে মনুষ্যকুলের সূচনা হোক। কিন্তু এই চার কুমার পিতার আদেশ অমান্য করে বিশ্বজুড়ে সত্ত্বগুণের প্রকাশ করতে এবং সারাজীবন দেবার্চনা করে কৌমার্য বজায় রাখতে অধিক উদ্যোগী হন৷অর্থাৎ তাঁরা বিবাহ করায় আপত্তি জানান এবং সারাজীবন কুমার হয়ে থেকে বিশ্বজুড়ে সত্ত্বগুণের প্রকাশ করার জন্য পরিভ্রমন করতে থাকেন।

অন্য একটি মতানুসারে ব্রহ্মার তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে শ্রীনারায়ণ এই চার কুমার রূপে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। যাইহোক, এই চারজন কুমার ছিলেন সনক, সনন্দন, সনাতন ও সনৎকুমার। তো একদা এই চার কুমার বৈকুণ্ঠলোকে শ্রীবিষ্ণুর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য মনস্থির করলেন।

সেদিন বৈকুণ্ঠে দেবী শ্রীলক্ষ্মীর সাথে বিশ্রাম করছিলেন শ্রীবিষ্ণু। এবং তাঁদের কক্ষের দ্বারপাল বা দ্বাররক্ষী হিসেবে পাহারা দিচ্ছিলেন পরম বিষ্ণুভক্ত দুই প্রহরী। এদের নাম জয় এবং বিজয়। এরা ভগবান বিষ্ণুর এত বড় ভক্ত ছিলেন যে বিষ্ণুদেব ও লক্ষ্মীদেবীর আজ্ঞা ভিন্ন তাঁরা কিছুই জানতেন না। এমনকি খুব বেশীক্ষণ ভগবান বিষ্ণুকে না দেখেও থাকতে পারতেন না তাঁরা। তাঁদের সর্বান্তকরণে কেবল বিষ্ণু ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তো ভগবান বিষ্ণু বিশ্রামে যাওয়ার আগে এই দুই প্রহরীকে নির্দেশ দিলেন, বিশ্রাম করার সময় কেউ যেন তাঁদেরকে বিরক্ত না করেন। ভগবানের আদেশ মাথায় নিয়ে জয় বিজয়ও সতর্ক প্রহরা দিতে শুরু করলেন।

আরও পড়ুনঃ  হিন্দু বিবাহে সাত পাক ঘোরা হয় কেন?

ঠিক সেই সময়ে বৈকুণ্ঠের বাইরের ছয়টি দ্বার অতিক্রম করে সপ্তম দ্বারের সামনে এসে হাজির হন চার কুমার। আর এই সপ্তম দ্বারের প্রহরায় নিয়োজিত ছিলেন জয় এবং বিজয়। তো চার কুমার জয় বিজয়কে সপ্তম দ্বার খুলে দিতে বললেন যাতে তাঁরা শ্রীবিষ্ণুর সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত জয় এবং বিজয় এই চারজন কুমারকে চিনতে পারেন নি। কারন এই কুমারগণ দীর্ঘ আয়ুযুক্ত হলেও শারীরিকভাবে ছিলেন খর্বকায়। অর্থাৎ, তাঁরা বয়স্ক হলেও দেখতে ছিলেন শিশুদের মত। একারনে জয় বিজয় তাঁদেরকে সাধারন শিশু ভেবে বৈকুণ্ঠের সপ্তম দ্বার ভেদ করে বিষ্ণুর সাক্ষাৎ-এ যেতে বাঁধা দেন। তাঁরা এই চার কুমারকে বলেছিলেন, “বিষ্ণুদেব এখন শয্যাগ্রহণ করছেন ফলে তিনি এখন দর্শন দিতে অপারক”

ফলে জয় ও বিজয়ের ওপর তুমুল ক্রুদ্ধ হন চতুর্কুমার। কারণ তাঁদের এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের যে কোন স্থানে নিশর্ত প্রবেশাধিকার ছিল। তাঁরা উত্তরে জয় ও বিজয়কে বললেন, “বিষ্ণু তার দর্শনপ্রার্থীদের ও ভক্তদের জন্য সর্বদাই উপলব্ধ থাকেন৷ সুতারাং আমাদেরকে শ্রীভগবানের দর্শন পেতে বাঁধা দিও না।” কিন্তু তা স্বত্বেও জয় ও বিজয় চতুষ্কুমারকে বিষ্ণু-দর্শনে যাওয়ার অনুমতি দিলেন না।

ফলে যা হওয়ার তাই হল। ক্রুদ্ধ কুমারগণ জয় বিজয়কে অভিশাপ দিলেন, “ হে পাষণ্ড দ্বারপালগণ, আমরা তোমাদেরকে অভিশাপ দিচ্ছি, আমাদেরকে ভগবান দর্শনে বাঁধা প্রদান করার জন্য তোমরা মর্ত্যে মরণশীলরূপে জন্ম নেবে এবং সাধারণ মানুষের মতোই জন্ম-মৃত্যুর মায়াচক্রে তোমাদেরকে জীবন অতিবাহিত করতে হবে।”

বৈকুণ্ঠের সপ্তম দ্বারের বাইরে জয়, বিজয় ও চার কুমারের উচ্যবাচ্য শুনে সেখানেই প্রকট হলেন ভগবান শ্রীবিষ্ণু। তিনি চার কুমারকে চিনতে পারলেন এবং জয় বিজয়কে দেওয়া অভিশাপ সম্পর্কেও অবগত হলেন। ততক্ষণে ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে আঁচ করতে পেরেছেন জয় ও বিজয়। তাঁরা শ্রীবিষ্ণুর চরণে সটান লুটিয়ে পড়ে বললেন, “হে প্রভু, আমরা সত্যিই লজ্জিত। আমরা আপনার আদেশ পালন করতে গিয়ে এই চার কুমারের প্রকৃত পরিচয় জানতে পারি নি। দয়া করে আমাদের এই অভিশাপ থেকে মুক্তির উপায় বলুন।”

আরও পড়ুনঃ  দ্রৌপদী ও পঞ্চপাণ্ডব কিভাবে দেহত্যাগ করেন? How did Draupadi and Pancha Pandavas Die?

উত্তরে ভগবান বললেন, “দেখ বৎসগণ, ব্রহ্মার মানসপুত্র এই চার কুমারের অভিশাপ কোনভাবেই বিফল হওয়ার নয়। তবে আমি নিজ দায়ীত্বে  দুইটি উপায়ে তোমাদের এই অভিশাপ কিছুটা প্রশমিত করতে পারি। প্রথম উপায় হল তোমরা ৭ জন্ম আমার ভক্ত হয়ে মর্ত্যে জন্ম গ্রহণ করবে এবং বিষ্ণুভক্ত হিসেবে বিশেষ খ্যাতিলাভ করবে। অতঃপর ২য় উপায় হচ্ছে, তোমরা তিন জন্ম আমার শত্রু হয়ে মর্ত্যে জন্মগ্রহণ করবে এবং প্রত্যেক জন্মেই আমি নিজে অবতার ধারণ করে তোমাদেরকে সংহার করব। এই দুটি শর্তের যেকোন একটিকে তোমাদেরকে বেছে নিতে হবে এবং এই শর্ত পূর্ণ হওয়ার পরেই কেবল তোমরা আবারও তোমাদের পূর্ব দায়ীত্বে ফিরে যেতে পারবে।”

জয়-বিজয়ের সামনে তখন কঠিন অগ্নি পরীক্ষা। যাদের সর্বান্তকরন জুড়ে শুধুমাত্র ভগবান বিষ্ণুর বাস তাঁদেরকে যেতে হবে নশ্বর মর্ত্যধামে। যারা শ্রীবিষ্ণু ও দেবী শ্রীলক্ষ্মীকে না দেখে একটি ক্ষণ অতিবাহিত করতে পারেন না তাঁদেরকে জন্ম-জন্মান্তরের জন্য যেতে হবে পৃথিবীতে। কিন্তু কি আর করা? যেহেতু তিন জন্ম ভগবানের শত্রুরূপে জন্মালে শ্রীঘ্রই ভগবানের কাছে বৈকুণ্ঠলোকে ফিরে আসা যাবে তাই তাঁরা ২য় উপায়টিকেই বেছে নিলেন। অর্থাৎ তাঁরা তিন জন্মে ভগবানের শত্রুরূপে জন্মগ্রহণ করে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর হাতেই বধিত হওয়ার পথটি বেছে নিলেন।

আর তাই প্রথম জীবনে তথা সত্য যুগে তারা মহর্ষি কশ্যপ এবং প্রজাপতি দক্ষর কন্যা দিতির দুই পুত্র তথা হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশিপু নামে জন্মগ্রহণ করেন৷ এবং এই যুগেই ভগবান বিষ্ণু বরাহ অবতার ধারণ করে হিরণ্যাক্ষকে বধ করেন এবং নৃসিংহ অবতার ধারণ করে বধ করেন হিরণ্যকশিপুকে৷ দ্বিতীয় জীবনে তথা ত্রেতাযুগে তাঁরা ঋষি বিশ্রবা ও রাক্ষসী নিকষার দুই পুত্র রাবণ ও কুম্ভকর্ণ নামে জন্মগ্রহণ করেন৷ এবং শ্রীবিষ্ণু রাম অবতার ধারণ করে  রাবণ ও কুম্ভকর্ণ উভয়কেই বধ করেন৷একইভাবে তৃতীয় জীবনে তথা দ্বাপরযুগে তারা শিশুপাল ও দন্তবক্র রূপে মর্ত্যে জন্মলাভ করেন এবং ভগবান বিষ্ণুর পূর্ণাবতার শ্রীকৃষ্ণের হাতে তাঁরা উভয়ই বধিত হন।

আরও পড়ুনঃ  রহস্যময় কোণার্ক সূর্য মন্দিরের ইতিহাস || History of Mysterious Konark Surya Mandir ||

5/5 - (1 vote)

Leave a Reply